প্রিয়াঙ্কা মান্না। কলকাতা সারাদিন।
দুর্গাপুজো বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব। কিন্তু সেই দুর্গা দর্শনের সুযোগ সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকে শরৎকালের কয়েকটি দিনের মধ্যেই। এবার সেই সীমাবদ্ধতা ভাঙতে উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিকল্পনায় নিউটাউনে তৈরি হচ্ছে বিশাল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স ‘দুর্গা অঙ্গন’, যেখানে সারা বছরই দর্শনার্থীরা দুর্গা ও তাঁর পরিবারের মন্দিরে পুজো দিতে পারবেন।
ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৭ সালের মধ্যেই পুরো প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে নিউটাউনের অ্যাকশন এরিয়া–১ এলাকায় প্রায় ১৭ একরেরও বেশি জমির উপর এই বিশাল কমপ্লেক্স গড়ে উঠছে।
বর্ষার আগেই শেষ হবে ফাউন্ডেশনের কাজ
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে ওয়েস্ট বেঙ্গল হাউজিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (হিডকো)। সংস্থার আধিকারিকদের দাবি, নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়সূচি মেনেই এগোচ্ছে।
হিডকো সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি বছরের বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই ফাউন্ডেশন বা ভিত্তি নির্মাণের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এরপর শুরু হবে মূল স্থাপত্য কাঠামো বা সুপারস্ট্রাকচারের নির্মাণ।
প্রকল্পের প্রাথমিক ধাপে জমি সমতলকরণ এবং ভিত্তি তৈরির বেশ কিছু কাজ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। নির্মাণস্থলের সাম্প্রতিক ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বড় পরিসরে কাজ এগিয়ে চলেছে।
রাজস্থানের বেলেপাথরে তৈরি হবে মূল মন্দির
‘দুর্গা অঙ্গন’-এর মূল আকর্ষণ হবে একটি বিশাল স্থায়ী দুর্গা মন্দির। এই মন্দির নির্মাণে ব্যবহার করা হবে রাজস্থানের বেলেপাথর, যা ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যে বহুল ব্যবহৃত।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মন্দিরের গর্ভগৃহের উচ্চতা হবে প্রায় ৫৪ মিটার। পুরো স্থাপত্যে থাকবে সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং প্রাচীন ভারতীয় মন্দির শিল্পের ছাপ।
মন্দির চত্বরে প্রবেশের জন্য তৈরি করা হবে একটি বিশাল সিংহদ্বার। সেই প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকলেই দর্শনার্থীদের সামনে প্রথমে পড়বে কার্তিক ও গণেশের মন্দির।
মূল দুর্গা মন্দিরের পাশেই থাকবে লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মন্দির। আর মন্দির কমপ্লেক্সের পিছনের অংশে নির্মিত হবে শিব মন্দির। ফলে পুরো এলাকা দেবী দুর্গা ও তাঁর পরিবারের পূজার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
দুর্গাপুজোর ইতিহাস নিয়ে আধুনিক মিউজিয়াম
শুধু মন্দির নয়, ‘দুর্গা অঙ্গন’-এ তৈরি হবে একটি আধুনিক দুর্গাপুজো মিউজিয়াম। সেখানে তুলে ধরা হবে বাংলার দুর্গাপুজোর দীর্ঘ ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সময়ের সঙ্গে তার বিবর্তন।
মিউজিয়ামে থাকবে ডিজিটাল ডিসপ্লে, অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন, ছবি এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য। কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজো থেকে শুরু করে আধুনিক থিম পুজোর নানা দিক সেখানে তুলে ধরা হবে।
সংস্কৃতি গবেষক, শিল্পী এবং পর্যটকদের জন্য এই মিউজিয়াম একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
পর্যটনের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে নিউটাউন
এই প্রকল্পকে ঘিরে শুধু ধর্মীয় কেন্দ্র নয়, একটি বড় সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করার পরিকল্পনাও রয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য থাকবে বিস্তৃত খোলা জায়গা, বসার ব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য বিশেষ মঞ্চ।

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় এক লক্ষ দর্শনার্থীকে ধারণ করার মতো পরিকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। বড় উৎসব বা বিশেষ অনুষ্ঠানের সময় আরও বেশি মানুষের উপস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো ব্যবস্থা থাকবে।

পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হলে নিউটাউন এলাকায় একটি নতুন আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র তৈরি হতে পারে। দুর্গাপুজো যেহেতু ইতিমধ্যেই ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে, তাই এই স্থায়ী কমপ্লেক্স বিদেশি পর্যটকদের কাছেও বড় আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।

সংস্কৃতি ও পর্যটনের নতুন দিগন্ত
রাজ্য সরকারের ধারণা, ‘দুর্গা অঙ্গন’ শুধু একটি মন্দির প্রকল্প নয়—এটি বাংলার সংস্কৃতি, শিল্প ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের একটি স্থায়ী প্রদর্শন ক্ষেত্র হয়ে উঠবে।
প্রতিবছর দুর্গাপুজোর সময় যেভাবে কলকাতায় পর্যটকদের ঢল নামে, সেই আবহকে সারা বছর ধরে ধরে রাখার লক্ষ্যেই এই প্রকল্প। সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই নিউটাউন পাবে এক নতুন পরিচয়—বাংলার দুর্গা সংস্কৃতির স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে।