সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
জীবন কখনও কখনও আশ্চর্য রকমভাবে ফিরে আসে। তেমনই এক বিস্ময়কর ঘটনার সাক্ষী থাকল দক্ষিণ কলকাতার এম আর বাঙুর হাসপাতাল। টানা ৫০ দিনেরও বেশি ভেন্টিলেশনে থাকা এক কোমাচ্ছন্ন যুবক অবশেষে নতুন জীবন ফিরে পেলেন চিকিৎসকদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায়।
আসানসোলের রানিগঞ্জের বাসিন্দা ৩৭ বছরের সমর দাস গাড়ি চালানোর সময় আচমকাই ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। দ্রুত তাঁকে প্রথমে বর্ধমান মেডিক্যালে ভর্তি করা হলেও অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। নিউরো সার্জারির পর কার্যত কোমায় চলে যান তিনি। ব্রেনের শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী অংশ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এর ফলে দেখা দেয় ভয়ঙ্কর সমস্যা – ‘অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম’।
কেবল তাই নয়, সেপসিসের আক্রমণে অকেজো হয়ে যায় কিডনি ও লিভারও। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে পড়ে যে তাঁকে ভেন্টিলেশনে রেখে কৃত্রিমভাবে বাঁচানোর চেষ্টা শুরু হয়। রোগীর পরিবারও ভেবেছিলেন হয়তো আর ফেরানো সম্ভব হবে না। কিন্তু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অবিচল প্রচেষ্টায় ঘটল অলৌকিক পরিবর্তন।
২০ জুন থেকে এম আর বাঙুরের সিসিইউ-র ৭০৩ নম্বর বেডেই শুরু হয় তাঁর নতুন জীবনের লড়াই। চিকিৎসকরা দ্রুত ট্র্যাকিওস্টমি করে কৃত্রিমভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস চালু করেন। পাশাপাশি চলতে থাকে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকস, প্রয়োজনীয় জীবনদায়ী ইঞ্জেকশন, চেস্ট ফিজিওথেরাপি ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ। ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে।
চিকিৎসকদের কথায়, এই ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে প্রতিদিনই নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। ভেন্টিলেশনে দীর্ঘদিন ধরে রাখা রোগীর শরীরে নানা জটিলতা তৈরি হয়। সংক্রমণ, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, কিডনি ও লিভারের কাজ চালিয়ে যাওয়া— প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি দরকার। কিন্তু সমর দাসের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সঠিক সিদ্ধান্ত, সময়মতো ওষুধ প্রয়োগ ও নিয়মিত ফিজিওথেরাপিই শেষ পর্যন্ত তাঁকে ফের জীবনের আলোয় ফিরিয়ে আনে।
আরও এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, রোগীর পরিবারকে বাইরে থেকে একটি অ্যান্টিবায়োটিকও কিনতে হয়নি। হাসপাতালের সরবরাহ করা ওষুধেই চিকিৎসা সম্পূর্ণ হয়েছে। ফলে আর্থিক চাপও তুলনামূলকভাবে কম পড়েছে।
অবশেষে টানা ৫০ দিনেরও বেশি সময় পর বুধবার হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান সমর দাস। হাসপাতালের করিডরে যখন তাঁকে দেখা যায়, তখন চিকিৎসক ও নার্সদের চোখেমুখে ছিল সাফল্যের আনন্দ। রোগীর পরিবারও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন হাসপাতালের সমস্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি।
এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করে দিল যে সঠিক চিকিৎসা, ধৈর্য এবং আধুনিক চিকিৎসা-ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। এম আর বাঙুর হাসপাতালের চিকিৎসকরা কেবল একজন রোগীকে নয়, একটি পরিবারকে নতুন জীবন উপহার দিলেন।
স্ত্রী অপর্ণা জানালেন, “আমাদের ছ’ বছরের একটি মেয়ে আছে। উনি আমাদের একমাত্র উপার্জনশীল মানুষ। গাড়ি চালাতেন। ডাক্তারবাবুদের চেষ্টায় প্রাণে বেঁচেছেন। কিন্তু কবে উনি আবার কাজে ফিরতে পারবেন জানা নেই। কীভাবে সংসার চলবে ভেবেই আকুল হয়ে উঠছি। ওঁর ওষুধ, ফিজিওথেরাপির খরচ কীভাবে চালাব বুঝতে পারছি না।”