সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘আমরা থাকতে আপনাদের তাড়াতে দেব না। আমি বলছি, আপনারা ভয় পাবেন না। আমি থাকতে বাংলার মানুষের গায়ে হাত দিতে দেব না। ভয় পাবেন না, বিজেপি ভয় দেখিয়ে রাজনীতি করছে।’ এভাবেই এসআইআর আবহে বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে আসা মতুয়াদের গড় বলে পরিচিত বনগাঁর ত্রিকোণ পার্কের সভা থেকে আশ্বস্ত করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার বনগাঁর ত্রিকোণ পার্কে সভা থেকে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনকে তীব্র আক্রমণ করলেন। কেন তাড়াহুড়ো করে ২ মাসে এসআইআর করা হচ্ছে, তা নিয়ে ফের জাতীয় নির্বাচন কমিশন ও বিজেপিকে নিশানা করলেন তিনি। নারী শক্তির প্রতীক হিসেবে বাংলায় তিনি রয়েছেন জানিয়ে মমতা বলেন, ‘আমি যদি কিছু ধরি, শেষ করে ছাড়ি। আমি ভোটের রাজনীতি করি না, মানুষের রাজনীতি করি। তৃণমূল কংগ্রেস থাকতে আমরা কারও গায়ে হাত দিতে দেব না। রাস্তাই আমায় রাস্তা দেখায়।’ এসআইআর নিয়ে কমিশনকে নিশানা করে তিনি বলেন, ‘এসআইআর করতে ৩ বছর লাগে। আমরা এসআইআরের বিরোধী নই। কিন্তু, কেন ২ মাসে করা হচ্ছে?’
এদিন প্রথমে হেলিকপ্টারে বনগাঁর সভায় যাওয়ার কথা ছিল মমতার। কিন্তু, হেলিকপ্টারের বিমা বা ইনস্যুরেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এদিন হেলিকপ্টার ওড়ানো সম্ভব হয়নি। শেষে সড়কপথে বনগাঁ যান তৃণমূল সুপ্রিমো। আর সভাতে সেই প্রসঙ্গ তুলে মমতা বলেন, ‘প্রথমেই আপনাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিই। আমার আসতে একটু আসতে দেরি হয়েছে। এর পিছনে একটা মজা রয়েছে। মজাটা কী। আমি গত সাত আট মাস হেলিকপ্টার ব্যবহার করি না। গাড়িতেই জেলায় জেলায় যাই। আজকে যেহেতু এখানে একটা সভা রয়েছে। তারপর ঠাকুরনগর যাব। ঠাকুরনগর থেকে ফিরতে হবে। সরকারের একটা হেলিকপ্টার নেওয়া রয়েছে। আমার বেরনোর আগে হঠাৎ খবর এল, হেলিকপ্টার যাবে না। আমি দেখলাম, দারুণ মজার খবর তো। নির্বাচনই শুরু হল না, তার মধ্যেই কনফ্রন্টেশন শুরু হয়ে গেল। কিন্তু, ওরা বুঝল না, এতে আমার ভালই হল। কারণ, আমি রাস্তায় আসতে আসতে প্রচুর মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে। আমার জনসংযোগ হল। আমি বিজেপিকে বারবার বলি, ওরে আমার সঙ্গে খেলতে যাস না। আমার সঙ্গে খেলতে গেলে আমি যে খেলাটা খেলব, সেই খেলায় তোমরা আমাকে ধরতেও পারবে না। ছুঁতেও পারবে না। নাগালও পাবে না।’ বিজেপিকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘সারা ভারত সরকার বসে থাক। সব এজেন্সি নিয়ে বসে থাক। কোটি কোটি টাকা খরচ করো। টাকা গুঁজে গুঁজে দাও। মানুষ টাকা নেবে, কিন্তু মানুষ ভোট দেবে না। তুমি একবার টাকা দেবে, বছরের পর বছর চলবে কী করে।’
এদিন সভার প্রথম থেকেই চড়া সুরে বিজেপিকে আক্রমণ করেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন এলেই রাজ্যের তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীদের গ্রেফতার শুরু করে কেন্দ্রীয় এজেন্সি। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘যদি অনুপ্রবেশের জন্যেই এসআইআর হয়, তাহলে মধ্যপ্রদেশে নাটক করছেন কেন! রাজস্থানে নাটক করছেন কেন! তিনি জানান, বাংলা-সহ চার রাজ্যে নির্বাচন একই সঙ্গে। তিনি বাংলা বাদে আর কোথাও এসআইআর হচ্ছে না, কেন? বাংলাকে পছন্দ না! বাংলাকে জব্দ করতে চাইছো, বাঙালিকে, বাংলা ভাষাকে স্তব্ধ করতে চাইছো?’

মঙ্গলবারের সভায় তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি বিজেপির বিরুদ্ধে তোপ দাগলেন, অভিযোগ তুললেন আজ বাংলায় কথা বললেই মানুষকে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দেওয়া হচ্ছে। মঞ্চে দাঁড়িয়েই তৃণমূলনেত্রীর স্পষ্ট বক্তব্য, ‘বাংলা ভাষায় কথা বললেই বাংলাদেশি? আমি বীরভূমে জন্মেছি, না হলে আমাকেও বাংলাদেশি বলত!’ এই এক বাক্যেই যেন জনতার সামনে তুলে ধরলেন তাঁর ক্ষোভ, উদ্বেগ ও ভাষাগত অসম্মান নিয়ে তৃণমূলের অবস্থান। তৃণমূলের দাবি, দেশের নানা প্রান্তে শুধুমাত্র বাংলা বলার কারণে বাংলাভাষীরা অপমান ও হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। কোথাও চলছে নির্বিচারে ধরপাকড়, কোথাও অফিসের কাজে বাংলায় কথা বললে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা এই পরিস্থিতিকে ভাষা অস্মিতার সরাসরি আঘাত বলেই ব্যাখ্যা করলেন মুখ্যমন্ত্রী।
বাংলায় বিজেপি ভয় দেখিয়ে প্রচার করছে বলে অভিযোগ তৃণমূল সুপ্রিমোর। তিনি বলেন, রক্তচক্ষু দেখাচ্ছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। কিন্তু বাংলার মাটির সংগ্রামের মাটি, তারা আপনাদের ভয় পায় না। বাংলা দখল করতে চায় বিজেপি। মমতার কথায়, ‘বাংলা দখল করতে গিয়ে গুজরাট হারাবে, দেশ হারাবে। তৃণমূলের কেউ কিছু না করলেও তাঁকে জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। বিজেপির চুরি করলেও কিছুই হয় না।’

এসআইআর নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করে মমতা বলেন, ‘এসআইআর আতঙ্কে ৩৫-৩৬ জনের মৃত্যু। ১০ জন বিএলও হাসপাতালে ভর্তি। কৃষ্ণনগরে রিঙ্কু মৃত্যুর আগে চিঠি লিখে গিয়েছে। লিখেছে আমার মৃত্যুর জন্য নির্বাচন কমিশন দায়ী। তাহলে কার কথায় চলছে? ইন্টারনেট নেই। হোয়াটসঅ্যাপ নেই। রামের জায়গায় শ্যাম চলে যাচ্ছে। ড্রাফ্ট লিস্ট বেরোলে বুঝতে পারবেন কী হয়। আমার বাংলা ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে। আর আঘাত করলে, প্রত্যাঘাত সহ্য করতে হবে।’
ভবিষ্যদ্বাণী করে মমতা বলেন, ‘বাংলা দখল করতে গিয়ে গুজরাট হারাবে, দেশ হারাবে। ২০২৯ বড় ভয়ংকর। ক্ষমতা হারাবে বিজেপি।’ তিনি সাফ জানান, আমাকে (অর্থাৎ বাংলার মানুষকে) আঘাত করলে, সারা ভারতবর্ষ হিলিয়ে দেব। মমতার তোপ, ‘বিজেপির কথায় চলছে নির্বাচন কমিশন।’ ব্যাখ্যা করে মমতা বলেন, ‘এসআইআর করতে হবে না আমরা বলিনি। আমরা বলেছি কোনও বৈধ ভোটারের নাম যেন বাদ না যায়। এসআইআর করতে ৩ বছর সময় লাগে। আপনারা ২ মাসে করতে চাইছেন। ভোটের আগে গায়ের জোর দেখিয়ে এসআইআর। আমাকেও সময় দিয়ে আধার কার্ড করতে হয়েছে। এখন বলছে লাগবে না। ব্যাঙ্ক, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে নো আধার। আর এসআইআর হলে ইয়েস আধার।’
এর পরেই বাংলার বিরুদ্ধে বিজেপি-র ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে মমতার হুঁশিয়ারি, ‘জানেন তো, জীবিত বাঘের চেয়ে আহত বাঘ বেশি ভয়ংকর। তাই আঘাত করবেন না। আঘাত করলে প্রত্যাঘাত সহ্য করতে হবে।’