সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তনের পথে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। সরকারি স্কুলেও এবার ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ার সুযোগ তৈরি করতে ২৫০০ কোটি টাকার এক উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়েছে। মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু জানান, রাজ্যের ৪৩০টি স্কুলকে ধাপে ধাপে বিশ্বমানের মডেল স্কুল হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এই প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে Asian Development Bank (এডিবি)।
মোট ব্যয়ের ৭০ শতাংশ দেবে এডিবি এবং বাকি ৩০ শতাংশ বহন করবে রাজ্য সরকার। পাঁচ বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা দফতরের মতে, এই উদ্যোগ কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং শিক্ষার গুণগত মানে আমূল পরিবর্তন আনবে।
কীভাবে বাছাই হবে স্কুল?
শিক্ষামন্ত্রী জানান, রাজ্যের প্রতিটি ব্লক থেকে অন্তত একটি করে স্কুল বেছে নেওয়া হবে। আর যেসব ব্লক তুলনামূলকভাবে অনগ্রসর, সেখান থেকে দুটি করে স্কুল নির্বাচন করা হবে। এভাবেই মোট ৪৩০টি স্কুলকে ‘মডেল স্কুল’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
এই স্কুলগুলিতে থাকবে আধুনিক ডিজিটাল পরিকাঠামো, স্মার্ট ক্লাসরুম, উন্নত বিজ্ঞান ল্যাব এবং ভোকেশনাল বা বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সুযোগ। পড়াশোনা হবে বাংলা ও ইংরেজি—দুই মাধ্যমেই। অর্থাৎ, সরকারি স্কুলেও অভিভাবকেরা ইংলিশ মিডিয়াম বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
কেন এই সিদ্ধান্ত?
বর্তমানে বহু অভিভাবক সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে অনেক সরকারি স্কুলে ছাত্রসংখ্যা কমে যাচ্ছে। কোথাও শিক্ষক আছেন, পড়ুয়া নেই। কোথাও আবার পড়ুয়া আছে, পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। এই ভারসাম্যহীনতা স্বীকার করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নিজেও।
ব্রাত্য বসুর কথায়, ইংরেজি মাধ্যমের চাহিদা বৃদ্ধিই সরকারি স্কুল থেকে পড়ুয়া সরে যাওয়ার অন্যতম কারণ। তাই সেই চাহিদাকে স্বীকৃতি দিয়েই সরকারি ব্যবস্থার মধ্যেই ইংলিশ মিডিয়াম চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সরকারি স্কুলের প্রতি নতুন করে আস্থা তৈরি হবে বলে মনে করছে শিক্ষা দফতর।
শিক্ষক নিয়োগে বড় সম্ভাবনা
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী। শিক্ষামন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন, আগামী দিনে বড় আকারে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। নতুন পরিকাঠামো, আধুনিক পাঠ্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাদানের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষিত শিক্ষকের প্রয়োজন হবে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এর ফলে কয়েক হাজার শিক্ষিত বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে আন্দোলন চলছে রাজ্যে। সেই প্রেক্ষাপটে এই ঘোষণা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
শিক্ষাক্ষেত্রে আরও সিদ্ধান্ত
শুধু মডেল স্কুল প্রকল্প নয়, মন্ত্রিসভায় আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কলকাতার একটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগে সাতটি নিয়মিত শিক্ষক পদ সৃষ্টি ও পূরণের প্রস্তাবে অনুমোদন মিলেছে। পাশাপাশি রাজ্যের ঔষধ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাগারে মোট ১০টি বৈজ্ঞানিক পদ পূরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জুনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার, সিনিয়র সায়েন্টিফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং জুনিয়র সায়েন্টিফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট পদ।
সরকারি সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ফাঁকা পড়ে থাকা পদগুলি পূরণ করাই মূল লক্ষ্য। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই সিদ্ধান্ত কর্মসংস্থানের বার্তা দেওয়ারও একটি কৌশল হতে পারে।
সরকারি স্কুল কি ফিরে পাবে আস্থা?
এক সময় সরকারি স্কুলই ছিল মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রথম পছন্দ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিকাঠামো ও ইংরেজি শিক্ষার অভাবে অনেকেই বেসরকারি স্কুলে ঝুঁকেছেন। এই নতুন প্রকল্প সেই চিত্র বদলাতে পারে কি না, এখন সেটাই বড় প্রশ্ন।

যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী আধুনিক ল্যাব, ডিজিটাল ক্লাসরুম, দক্ষ শিক্ষক এবং দ্বিভাষিক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সরকারি স্কুলে ফের ছাত্রসংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে গ্রামীণ ও অনগ্রসর অঞ্চলে এই উদ্যোগ শিক্ষার নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে ২৫০০ কোটি টাকার এই প্রকল্প বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক মোড় ঘোরানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন নজর থাকবে—ঘোষণার পর বাস্তবায়ন কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকর হয়।