ছবি তুলে অভিযোগ করলেই নড়বে পুরসভা, সেপ্টেম্বর থেকে থুতু-পানের পিক ফেললেও জরিমানা
সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
বাংলাকে জঞ্জালমুক্ত করতে এবার প্রযুক্তিকেই বড় অস্ত্র করছে রাজ্য সরকার। রাস্তায় যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা, থুতু বা পানের পিক ছড়ানো—এসবের বিরুদ্ধে এবার কড়া অবস্থান প্রশাসনের। আর সেই লক্ষ্যেই আজ ৩০ মে থেকে চালু হচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত ‘স্বচ্ছ অ্যাপ’।
মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল শুক্রবার এই নতুন উদ্যোগের কথা ঘোষণা করে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, প্রথমে সচেতনতা, তারপর কড়া ব্যবস্থা। অর্থাৎ এখনই জরিমানার খাঁড়া নামছে না ঠিকই, কিন্তু আগামী ১ সেপ্টেম্বরের পর নিয়ম ভাঙলে রেয়াত মিলবে না বলেই ইঙ্গিত প্রশাসনের।
প্রাথমিকভাবে রাজ্যের ১০টি পুরসভায় এই অ্যাপ পরিষেবা চালু করা হবে। পরে ধাপে ধাপে আরও বিস্তৃত করা হবে গোটা ব্যবস্থাকে। সরকারের দাবি, এই অ্যাপ শহর পরিষ্কার রাখার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হল, এবার অভিযোগ জানাতে আর দফতরে ঘুরতে হবে না। রাস্তায় আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখলেই মোবাইলে ছবি তুলে ‘স্বচ্ছ অ্যাপ’-এ আপলোড করা যাবে। সেই অভিযোগ সরাসরি পৌঁছে যাবে পুর প্রশাসনের কাছে।
অগ্নিমিত্রা পালের কথায়, “স্বচ্ছ, স্মার্ট ও আধুনিক বাংলার পথে এটা বড় পদক্ষেপ। নাগরিক সমস্যার সমাধান এবার মানুষের হাতের মুঠোয়।”
শুধু আবর্জনা নয়, নিকাশি সমস্যা, রাস্তার নোংরা, পুর পরিষেবার গাফিলতি—সব কিছু নিয়েই অভিযোগ জানানো যাবে এই অ্যাপের মাধ্যমে। প্রশাসনের তরফে দাবি, দ্রুত সমস্যার সমাধানেও নজর দেওয়া হবে।
তবে এখানেই শেষ নয়। শহরকে পরিষ্কার রাখতে এবার আচরণগত বদল আনার দিকেও জোর দিচ্ছে সরকার। রাস্তায় যত্রতত্র ময়লা ফেলা বা থুতু ছড়ানোর বিরুদ্ধে কড়া জরিমানার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
যদিও সরকার আপাতত তিন মাস সময় দিচ্ছে মানুষকে সচেতন হওয়ার জন্য। আগস্ট পর্যন্ত চলবে ব্যাপক প্রচারাভিযান। বিভিন্ন পুর এলাকায় মাইকিং, প্রচার শিবির এবং ডিজিটাল ক্যাম্পেনের মাধ্যমে মানুষকে বোঝানো হবে কীভাবে শহরকে পরিষ্কার রাখতে হবে।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, “এটা নতুন কোনও আইন নয়। আগে থেকেই নিয়ম ছিল। কিন্তু মানুষকে নতুন করে সচেতন করাই এখন মূল লক্ষ্য।”
এই সচেতনতা অভিযানের অংশ হিসেবেই প্রতি ১০০ মিটার অন্তর ডাস্টবিন বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, “ডাস্টবিন নেই তাই ফেললাম”—এই অজুহাতও আর চলবে না।
অগ্নিমিত্রা আরও বলেন, “পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস বাড়ি থেকেই শুরু করতে হবে। Reusable waste আর single-use waste আলাদা করতে হবে। নাগরিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে।”
প্রশাসনিক সূত্রে খবর, সেপ্টেম্বর থেকে পুর আইন অনুযায়ী নিয়ম ভাঙলে সরাসরি জরিমানা করা হবে। গুরুতর ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে। যদিও জরিমানার পরিমাণ নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই উদ্যোগ শুধু পরিচ্ছন্নতা অভিযান নয়, বরং শহুরে প্রশাসনকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করার বড় পদক্ষেপ। বিশেষ করে কলকাতা ও শহরতলির একাধিক পুর এলাকায় আবর্জনা, নিকাশি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে।
সাধারণ মানুষের একাংশ অবশ্য এই উদ্যোগকে ইতিবাচক বলেই মনে করছেন। তাঁদের মতে, অভিযোগ জানানোর সহজ পদ্ধতি থাকলে প্রশাসনের উপর চাপও বাড়বে। আবার অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—অভিযোগ নেওয়ার পর আদৌ কত দ্রুত কাজ হবে?
এই প্রশ্নের জবাবে প্রশাসনের দাবি, অভিযোগ নিষ্পত্তির উপর বিশেষ মনিটরিং থাকবে। অ্যাপের মাধ্যমে সমস্যার আপডেটও জানতে পারবেন নাগরিকরা।
রাজ্যের একাংশের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে স্মার্ট সিটি প্রকল্পের সঙ্গেও যুক্ত করা হতে পারে ‘স্বচ্ছ অ্যাপ’-কে। ফলে নাগরিক পরিষেবা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, প্রযুক্তি আর প্রশাসনকে একসঙ্গে এনে বাংলাকে “স্বচ্ছ ও আধুনিক” করার যে বার্তা দিল সরকার, তা নিয়ে এখন জোর চর্চা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে।
এখন দেখার, সেপ্টেম্বরের পর সত্যিই কি বদলাবে বাংলার শহরের ছবি? নাকি ‘স্বচ্ছ অ্যাপ’ও থেকে যাবে শুধুই আর এক সরকারি ঘোষণায়?