শৌভিক তালুকদার। কলকাতা সারাদিন।
‘আসন পুনর্বিন্যাসে কোনও রাজ্যের সঙ্গে ভেদাভেদ হবে না।’ সংসদের বিশেষ অধিবেশনে আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত বিল পেশ করার পরে দেশের সমস্ত বিরোধী দলের সাংসদদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখতে উঠে এভাবেই গ্যারান্টি দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে বিরোধীদের দাবি, এতে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিকে বঞ্চনা করা হবে। প্রধানমন্ত্রী মোদী এই বিলের গুরুত্ব বুঝিয়ে বলেন যে উত্তর, দক্ষিণ, ছোট বা বড় কোনও রাজ্যই আসন পুনর্বিন্যাসে বঞ্চনা বা ভেদাভেদের শিকার হবে না।
আসন পুনর্বিন্যাস বিল পেশ করার পাশাপাশি সংসদে আজ পেশ হয়েছে মহিলাদের সংরক্ষণ বিল। মহিলা সংরক্ষণ সংশোধনী বিল এবং আসন পুনর্বিন্যাস বিল-সমেত ৩ বিল পেশ হয়েছে। লোকসভার আসন সংখ্যা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৮৫০ করতে আসন পুনর্বিন্যাস বিল পেশ হয়েছে আজ। আলোচনার জন্য লোকসভায় ২৫১-১৮৫ ভোটে গৃহীত হল বিল।
তৃণমূল এবং কংগ্রেসসহ দেশের সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দলের সাংসদদের তরফে এই বিলের এখন পেশ করা নিয়ে তীব্র বিরোধিতা করা হলে বিরোধী সাংসদদের ৩৩ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণের বিরোধিতার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা অতীতে এই সংরক্ষণের বিরোধিতা করেছেন, তাদের দেশের মহিলারা ক্ষমা করেননি এবং তার পরের নির্বাচনে তারা অত্যন্ত খারাপ ফল করেছে। মহিলাদের সংরক্ষণ দেওয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ মিস করবেন না। আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ করছি-রাজনীতির লেন্স থেকে দেখবেন না, এটা দেশের স্বার্থে সিদ্ধান্ত। এটা ২৫-৩০ বছর আগেই চালু হওয়া উচিত ছিল। যখন এই ধারণা প্রথম উঠেছিল, তখনই চালু হওয়া উচিত ছিল। যদি তখন প্রণয়ন হত, আজ আমরা পরিণত দেশ হতাম। সংশোধনই তো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য্য। দেশের ইতিহাসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত থাকে, সমাজের মানসিকতা ও দেশের নেতৃত্বের দক্ষতা দেশের ইতিহাস তৈরি করে, ঐতিহ্য গড়ে। ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে আজ এমনই একটা দিন। এটা কোনও একটি নির্দিষ্ট দলকে সুবিধা দেবে না, বরং দেশের গণতন্ত্রের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মহিলাদের যারা অধিকার দিতে অস্বীকার করেছেন, তাদের ফল ভুগতে হয়েছে। যারা রাজনীতিতে এগিয়ে যেতে চান, তাদের এটা স্বীকার করতে হবে যে বিগত ২৫ বছর ধরে মহিলারা নেতৃত্ব হিসাবে উঠে এসেছেন। তাদের এই উত্থানকে স্বীকৃতি দিতে হবে। আজ যারা বিরোধিতা করবেন, তাদের দীর্ঘ সময় ধরে এর মূল্য চোকাতে হবে। আপনারা এর বিরোধিতা করলে আমার কিছুটা রাজনৈতিক লাভ হবে। কিন্তু সবাই একসঙ্গে মত দিলে কেউ একা লাভবান হবে না। আপনারা ক্রেডিটের কথা ভাবছেন? কাল এই বিল পাশ হলে আপনাদের সবার ছবি ছাপিয়ে ক্রেডিট দিয়ে দেব আপনাদের। সেটাই তো আপনারা চাইছেন? ক্রেডিটের ব্ল্যাঙ্ক চেক আপনাদের দিয়ে দিচ্ছি।’
আসন পুনর্বিন্যাস বিল পাস করানোর জন্য সমস্ত দলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে সংসদে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, ‘যারা এই বিলের বিরোধিতা করছেন, তারা শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য করছে। আমি বলছি যে এই প্রক্রিয়ায় কোনও ভেদাভেদ, অবিচার হবে না। আমি কথা দিচ্ছি। আপনারা যদি গ্যারান্টি শব্দ ব্যবহার করতে বলেন, তাই করব। যদি কথা দিতে বলেন, তাহলে তাই বলব। আমরা ভারতকে এক হিসাবে দেখি, বিভিন্ন খণ্ডে বা অংশ হিসাবে নয়। আসন পুনর্বিন্যাস কারোর সঙ্গে অবিচার করবে না।’
প্রসঙ্গত, মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ বাস্তবায়নের জন্য মোদি সরকার লোকসভার মোট আসন সংখ্যা বর্তমান ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবিত মোট আসনের মধ্যে রাজ্যগুলির জন্য ৮১৫টি এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির জন্য ৩৫টি আসন প্রস্তাব করা হয়েছে।

সংবিধানের ৮১ নম্বর ধারা অনুযায়ী লোকসভার সর্বোচ্চ আসন ৫৫২ হতে পারে। এর মধ্যে ৫৩০ জন বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে এবং ২০ জন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলি থেকে নির্বাচিত হতে পারে। ৮১ নম্বর ধারা অনুযায়ী এর আগে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান জনগোষ্ঠীর ২ জন সদস্য লোকসভায় মনোনীত হতেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জমানায় ২০১৯ সালে সংবিধানের ১০৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে তা তুলে দেওয়া হয়েছিল। এ বার ৮২ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব রয়েছে বিলে। ৮২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণনার শেষ হওয়ার পরে সংসদীয় নির্বাচনী এলাকার পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া শুরু করা যায়। কিন্তু, করোনার কারণে ২০১১ সালের পরে ২০২১ সালে জনগণনা করা যায়নি। ২০২৭ সালের জন্য জনগণনা শুরু হচ্ছে, আজ, বৃহস্পতিবার থেকে।
বিরোধীদের অভিযোগ, কিন্তু জনগণনার রিপোর্ট প্রকাশের আগেই লোকসভার আসন বাড়িয়ে মহিলা সংরক্ষণ চালু করতে চাইছে মোদি সরকার।