শোভন গায়েন। কলকাতা সারাদিন।
“ওরা হিন্দুত্বের আওয়াজকে ভয় পেয়েছে। এ ডর মুঝে আচ্ছা লাগা। তৃণমূলের লোকেরা খালি শুভেন্দুর নাম জপ করছে।” বিধানসভা থেকে সাসপেন্ড হওয়ার পরে মঙ্গলবার বিধানসভার বাইরে দাঁড়িয়ে এভাবেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তথা তৃণমূল সরকারকে তীব্র আক্রমণ করলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি গর্জে ওঠেন, “গত চারবছর ধরে বাংলার প্রধান বিরোধী দল হিসাবে কাজ করছে বিজেপি। ২ কোটি ২৭ লক্ষ জনগণ বিজেপির প্রার্থীদের নির্বাচিত করে বিধায়ক হিসাবে বিধানসভায় পাঠিয়েছে। কিন্তু, আমরা আক্রান্ত।”
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী সহ বিজেপি পরিষদীয় দলের ৪ বিধায়ককে ‘অনৈতিক ভাবে’ বহিষ্কারের অভিযোগ করে বিজেপি পরিষদীয় দল আজ বিধানসভার বাইরে ধর্না কর্মসূচি পালন করে। বিজেপির বিধায়করা স্লোগান তোলেন”হিন্দু বিরোধী তৃণমূল হায় হায়”। তার আগে দলীয় বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পালকে সঙ্গে নিয়ে বিধানসভার গেটের সামনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। আজকে বিধানসভার সিঁড়িতে সাসপেন্ডেড বিধায়করা সহ বিজেপির সমস্ত বিধায়করা ধর্ণা দেয়। বিজেপি পরিষদীয় দলের পক্ষ থেকে একটা নতুন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। যেখান থেকে আজকে এই কর্মসূচি সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছে বলে জানান শুভেন্দু । বিধানসভার বাইরে থেকে রাজ্যপালের দেওয়া ভাষণের জবাবী ভাষণ দেওয়ার কথা জানান শুভেন্দু অধিকারী। শুভেন্দুর দাবি, বাম-কংগ্রেস সঙ্গে বিরোধী আসনে ছিল তখন কোনও অ্যাকশন নেয়নি তৃণমূল সরকার। যত রাগ শুধুই বিজেপির উপর। শুভেন্দুর কথায়, “২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সিপিএম বিরোধী আসনে ছিল। একদিন বিরোধী দলনেতাকে সাসপেন্ড করেনি। ২০১৬ সাল থেকে একুশ পর্যন্ত কংগ্রেস ছিল, বাধা দেয়নি। কিন্তু বিজেপিকে প্রতি পদে পদে বাধা দেওয়া হয়।” এখানেই না থেমে সুর আরও চড়িয়ে তিনি বলেন, “এই বিধানসভাকে কলুষিত করেছেন এই মুখ্যমন্ত্রী। ২০০৬ সালে বিধানসভার মেম্বার না হয়েও তিনি এখানে ঢুকে সব আসবাবপত্র ভেঙেছেন। এই মুখ্যমন্ত্রী ২০০৫ সালে লোকসভার ডেপুটি স্পিকারকে কাগজ ছুঁড়ে মেরেছিলেন। যেমনভাবে পার্টি চালান তেমনভাবেই এই বিধানসভাকে তিনি নিজের সম্পত্তি হিসাবে ব্যবহার করেন। উনি আসবেন, অনেক ভাষণ দেবেন, আর মিথ্যার ফুলঝুড়ি ছড়াবেন।”
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “মমতা ব্যানার্জীর কর্মচারীরা বিধানসভার ভেতরে যে বক্তব্য রেখেছে, ওরা তো রাজনৈতিক ব্যক্তি নয়, ওরা সকলেই মমতা ব্যানার্জির কর্মচারী। তৃণমূল কংগ্রেস আদৌ কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এটা একটা বেসরকারি কোম্পানি। বাকিরা সবাই কর্মচারী। এই কর্মচারীরা বিধানসভার ভেতরে যা বলেছে , সরস্বতী পূজাকে কেন্দ্র করে… আমাকে, অগ্নিমিত্রা পালকে, বঙ্কিম ঘোষকে, বিশ্বনাথ কারককে সাসপেন্ড করেছে, বাংলার হিন্দু জনগোষ্ঠী এটা ভালোভাবে নেয়নি। আতঙ্কের কারণে তৃণমূল আজ সম্প্রীতির কথা বলছে। কিসের সম্প্রীতি? কেন হাইকোর্টে যেতে হয় সরস্বতী পুজোর জন্য? কেন শ্যামপুরে পাঁচটা দুর্গা মায়ের মূর্তি ভাঙ্গে? কেন বেলডাঙায় ৫০ টা মন্দির ভেঙেছে? আইসি জামাল ঘুষের টাকায় মন্দির মেরামত করিয়েছে। কেন এগুলো হবে? কেন তৃণমূলের বুথ সভাপতি আলামিন মন্ডল উখরা নগরের প্রধান শিক্ষক মহাশয়কে ‘পুজো করা যাবে না’ একথা বলবে? আলামিন গ্রেফতারও হয়নি, তৃণমূল থেকে সাসপেন্ডও হয়নি। আর হিন্দুদের জন্য, হিন্দুদের দেবদেবীদের সম্মানের জন্য বলতে গিয়ে আমাকে আর আমার তিন কলিগকে সাসপেন্ড করেছে। আমি গর্বিত আমি হিন্দু।”
এখানেই না থেমে শুভেন্দু অধিকারী আরও বলেন, “আমাদের লড়াই কোন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয় । আমাদের লড়াই সরকারের বিরুদ্ধে। মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। পুলিশ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে। কেন পুলিশের জয়েন্ট সিপি, ডিসিপিকে দিয়ে পুজো করতে হবে, যে কলেজে মমতা ব্যানার্জি পড়েছেন বলে দাবি করেন? আমাদের বক্তব্য পুলিশ এবং সরকারের বিরুদ্ধে। সরকার তোষামোদ করছে। এটা প্রমাণিত। তিনি পুরোহিতদের ভাতা দেন না । তিনি আমাদের রাজবংশী গুরুদের ভাতা দেন না। ইনি মতুয়া গোসাইদের ভাতা দেন না। ইনি জনজাতিদের গুরুদেবদের ভাতা দেন না । কিন্তু ইমাম ও মোয়াজ্জামদের ভাতা দেন । তাই এই সরকার তোষামোদকারী সরকার, এটা একবার নয় এক হাজার বার বলবো।”
অন্যদিকে, বিধানসভায় বিজেপির ধর্নার বিরুদ্ধে এবার সরব স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “যে যখন যা খুশি বলে যাবে সেটাকেই মেনে নিতে হবে বা সেই দাবিকে মান্যতা দিতে হবে এমন পরিস্থিতি নেই।” শুধু তাই নন তিনি আরও বলেন, “বিধানসভা জনগণের স্বার্থে আলাপ আলোচনার জায়গা। বিরোধী দলেরও সেখানে বড় ভূমিকা রয়েছে। আমরা চাই তারা গঠনমূলক আলোচনা করুক বিধানসভার অন্দরে।”
শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে তিনি বলেন, “বিরোধী দলনেতা হয়ে তিনি যে ধরণের বক্তব্য রাখছেন বা আচরণ করছেন তা বিধানসভার নিয়মের পরিপন্থী। বিধানসভার সকল সদস্যকে মনে রাখতে হবে বিধানসভার নিয়ম শৃঙ্খলা গরিমা বজায় রেখে চলতে হবে। ৩০ দিনের জন্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা সহ তিনজন বিজেপি বিধায়ককে যে সাসপেন্ড করা হয়েছে এটা তাদের আচরণের জন্য প্রাপ্য ছিল। বিষয়টা বিবেচনার জন্য ইতিমধ্যেই প্রিভিলেজ কমিটিকে পাঠানো হয়েছে। ওদের যদি শুভ বুদ্ধির সূচনা হয়, তাহলে ওরা আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে লিখিত আবেদন করলে পরিস্থিতি অনুযায়ী আমি বিষয়টি ভেবে দেখতে পারি।” পাশাপাশি স্পিকার এও ইঙ্গিত দেন বিজেপি দল এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী যদি নমনীয় হন তাহলে সাস্পেনশন তুলে নেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।