সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
৩১ অগাস্ট। বাংলার ইতিহাসে একটি কালো দিন। এই দিনেই শুধুমাত্র দুবেলা দুমুঠো পেট ভরা খাবারের দাবিতে খাদ্য আন্দোলনে শামিল হয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন খাদ্য আন্দোলনের শহীদ নুরুল ইসলাম। প্রত্যেক বছর একুশে জুলাই তৃণমূলের শহীদ দিবসের মঞ্চ থেকে শহীদ নুরুল ইসলামের মাকে সম্মান জানিয়ে সিপিএমকে আক্রমণ করেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে বছর ঘুরলেই যখন বাংলায় ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন, এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এবারের ৩১ অগাস্ট রবিবার খাদ্য আন্দোলনের সঙ্গে মমতা মিশিয়ে দিলেন ভাষা আন্দোলনকেও। একযোগে তীব্র আক্রমণ করলেন বাংলার প্রাক্তন শাসক দল সিপিএম এবং কেন্দ্রে বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিজেপিকে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে নুরুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখেন, শহিদ নুরুল ইসলামের পরিবার-সহ খাদ্য আন্দোলনের সকল শহিদের প্রতি আজ তাঁদের প্রয়াণ-দিবসে জানাই আমার বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য।
এরপরেই একযোগে সিপিএম এবং বিজেপিকে আক্রমণ জানিয়ে মমতা লিখেছেন, খাদ্যের অধিকার মানুষের চিরন্তন অধিকার। আমাদের বিরোধীরা এই অধিকারকে সম্মান দেয় না বলে আমার খারাপ-লাগা আছে। বামপন্থীরা এক সময় খাদ্য আন্দোলনের ভান করেছিল, কিন্তু সরকারে থাকাকালীন মানুষকে অনাহারে মেরেছে: আমলাশোলের মতো ঘটনার কথা আমরা ভুলিনি। আর, বিজেপি তো ভাষায়-ও মারে, ভাতেও মারে। সব টাকা দিল্লিতে আটকে তারা বাংলার মানুষকে উপোস করিয়ে শেষ করতে চায়।
তবে বাংলার মানুষ যেন অনাহারে মারা না যায় এবং গরিব মানুষকে যেন দুবেলা দুমুঠো ভাতের জন্য রাস্তায় আন্দোলনে নামতে নেওয়া হয় তার জন্য যেভাবে বিনামূল্যে রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে চাল গম আটা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই প্রকল্প যে আজ গোটা দেশের কাছে মডেল হয়ে উঠেছে সেই বিষয়টি তুলে ধরে মমতা লেখেন, খাদ্যের অধিকারকে সম্মান জানিয়ে আমাদের সরকার এ রাজ্যের মানুষের খাদ্য সুরক্ষার জন্য যা করেছে, তা আজ সারা দেশের মডেল। আমরাই চালু করেছি ‘খাদ্যসাথী’র মতো যুগান্তকারী প্রকল্প, যার আওতায় রাজ্যের ৮ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ আজ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে রেশন পাচ্ছেন। এর জন্য আমরা খরচ করেছি ১ লক্ষ ৫ হাজার কোটি টাকা। ‘দুয়ারে রেশন’ প্রকল্পে, গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৭ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ বাড়ির দোরগোড়ায় খাদ্যশস্য গ্রহণ করছেন। বাকি উপভোক্তারা তাঁদের সুবিধা ও পছন্দ অনুযায়ী রেশন দোকান থেকে খাদ্যশস্য গ্রহণ করছেন। এই বাবদ আমরা খরচ করেছি ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এছাড়াও, “মা” প্রকল্পে গরীব মানুষদের দুপুরের খাবার মাত্র ৫ টাকায় দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, খাদ্যসাথী প্রকল্পের জন্য চালের জোগান করতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই বছর রেকর্ড ৫৬.৩৬ লক্ষ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করেছে, যা ১৭ লক্ষ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের উপকৃত করেছে।
এটা আমার গর্ব, আমাদের সার্বিক প্রচেষ্টার ফলে আমাদের সরকার ২ কোটির বেশি মানুষকে দারিদ্র্যসীমার বাইরে আনতে সক্ষম হয়েছে।
সোজা কথায়, আজকের বাংলায়, সব মানুষের পূর্ণ খাদ্য সুরক্ষা আছে। সব গরীব মানুষ বিনা পয়সায় বা খুব সস্তায় এই রাজ্যে খাবার পান। কবি ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’-এর অমর কথা স্মরণ করে আজ বাংলার সকল নাগরিক বলতে পারেন, তাঁদের সন্তানরা ‘দুধে – ভাতে’ থাকেন, অন্নাভাব ঘুচেছে।
বাংলায় খাদ্য আন্দোলনের শহীদ
ইতিহাস বলে, ১৯৫৯ সালে খাদ্যের দাবিতে কলকাতায় বিক্ষোভ আন্দোলনে তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায় সরকার গুলি চালিয়ে ৮০ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছিল। সেই রেশ কাটতে না কাটতে আর্থিক সংকটে জর্জরিত মানুষ পুনরায় ১৯৬৬ সালে খাদ্যের দাবিতে আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন, তখনও তাদের কপালেও খাদ্যের বদলে পুলিশের গুলি জুটেছিল। কৃষ্ণনগর শহরে ৪ঠা মার্চ, পুলিশের গুলিতে ১৪ বছরের যুবক আনন্দ হাইত ও বাম আন্দোলনের কর্মী প্রণব বিশ্বাস, বসিরহাটে জ্বালানির জন্য কেরোসিনের দাবিতে নুরুল ইসলাম শহীদের মৃত্যু বরণ করেন।