সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘আজ সংবিধান দিবস এবং ড. বি.আর.আম্বেদকর ছিলেন সংবিধানের খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান। আপনাদের জানা উচিত যে তিনি অবিভক্ত বাংলা থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন—এটা আমাদের জন্য গর্বের, কারণ এই ইতিহাস অনেকেই জানেন না। আজ যখন গণতন্ত্র ও ধর্মীয় মূল্যবোধ আক্রমণের মুখে, নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে—তখন আমাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করতে হয়: এখন কি আমাদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে? এর পেছনে এনআরসি কাজ করছে। আমরা এতে স্তম্ভিত ও দুঃখিত। তাই আজ আমি এখানে দাঁড়িয়ে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষা করার শপথ নিচ্ছি, যেটা সর্ববৃহৎ।’ এভাবেই বুধবার সংবিধান দিবস উপলক্ষে রেড রোডে বাবাসাহেব আম্বেদকরের মূর্তিতে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে কেন্দ্রের মোদি সরকার এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশন যেভাবে বাংলায় এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু করেছে তার বিরুদ্ধে সুর চড়ালেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
ভারতের সংবিধান হাতে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাবাসাহেব আম্বেদকরের মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আজ যারা ক্ষমতায় আছে (বিজেপি) তাদের দয়ায় আমরা স্বাধীনতা পাইনি; আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য। স্বাধীনতার জন্য যারা লড়েছিলেন তাদের ৯০% ছিলেন বাঙালি, আর পাঞ্জাবও সবচেয়ে বড় অবদানকারী রাজ্যগুলোর একটি। ভারতকে নবজাগরণ ও বিপ্লব উপহার দিয়েছিল এই বাংলা। এখন আমি প্রস্তাবনাটা পড়ছি।’
এমনকি কেন্দ্রের মোদি সরকার নাকি জয় হিন্দ এবং বন্দেমাতরম স্লোগান তোলার উপরেও নিষেধাক্কা জারি করেছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি দেখছি সংবাদ মাধ্যমে বলা হচ্ছে যে, আমরা সংসদে ‘জয় হিন্দ’ এবং ‘বন্দে মাতরম’ বলতে পারব না—যদিও এটা সত্য কিনা আমি জানি না এবং আমি এবিষয়ে সাংসদের সঙ্গে কথা বলব। তারা কি বাংলার পরিচয় মুছে দিতে চাইছে? আমরা ভারতের অংশ এবং আমরা গর্বিত যে বাংলা বরাবরই লড়েছে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের জন্য। আজ আমরা মর্মাহত যে, গণতান্ত্রিক অধিকার মানুষের থেকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এবং ধর্মের ভিত্তিতে দেশজুড়ে বিভাজন বাড়ছে। মানুষ অত্যাচারিত হচ্ছে—তপশিলি, দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘু বা হিন্দু ভোটার—সকলেই। যারা মারা গেছেন, তাদের বেশিরভাগই হিন্দু। আমরা সবাই এক, এটা মনে রাখতে হবে। আমরা যদি ‘জয় হিন্দ’ এবং ‘বন্দে মাতরম’ বলতে না পারি এবং ওরা যদি রাজা রামমোহন রায়কে অসম্মান করে—এটা কি মেনে নেওয়া যায়? আপনারা আমাদের মাটিকে অসম্মান করছেন! একজন নেতা তিনিই, যিনি জনগণকে বোঝেন এবং সম্মান করেন। সব এজেন্সি এতে জড়িত! আমি সাংবাদিকদের দোষ দিচ্ছি না, তাদের কেনা হয়েছে। কারণ তাদের মালিকদের এই এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’
গতকাল অর্থাৎ মঙ্গলবার বনগাঁ এবং ঠাকুরনগরে মতুয়া গড়ে গিয়ে মতুয়া সম্প্রদায়ের বাসিন্দাদের নাগরিকত্ব কোন ভাবেই খর্ব হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন মমতা। আজ মতুয়াদের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে মমতা বলেন, ‘নাগরিকত্বের প্রশ্নে মানুষকে মৃত্যুর দোরগোড়ায় ঠেলে দিয়েছে। যারা কালও ঢাক বাজাচ্ছিল (বনগাঁয়), তারা কাঁদতে কাঁদতে আমাকে বলছে—আমি যেন তাদের বাঁচাই। যারা এই ইস্যু নিয়ে রাজনীতি করছে, সেটা লজ্জার! বিহারে মানুষের বাড়িঘর ভেঙে ফেলা হয়েছে। এটা বিজেপির কৌশল, ভোটের পর লুট করা। আমাদের এসবের বিরুদ্ধে একজোট হতে হবে।

বাংলার ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তত তিন বছর লাগার কথা থাকলেও জাতীয় নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় সরকার সেটা মাত্র তিন মাসে করার অবিশ্বাস্য চেষ্টা করছে বলে বুথ লেভেল অফিসাররা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘তিন বছরের কাজ দু’মাসে কীভাবে করবেন? এখন চাষাবাদের মরসুম। সাংবাদিকরাও সারাদিন বাড়িতে থাকেন না। এমনকি গণনা ফর্ম বিতরণের যে তথ্য দেওয়া হচ্ছে, তাও ভুল। আমরা সংবিধান মানব এবং তার হিসেবেই কাজ করব। স্বাধীনতা সংগ্রামীরা যে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, আমরা তা-ই অনুসরণ করব—বিজেপির নির্দেশ নয়। যখন আমি গতকাল ফিরছিলাম (বনগাঁ থেকে), কিছু মানুষ আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। আমি তাদের কথা শুনেছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। কিন্তু কেন বিএলও-দের ৪৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে শুধু নিজেদের কথা বলার জন্য? এটা কেমন ঔদ্ধত্য? ওরা (নির্বাচন কমিশন) আমাদের পক্ষ থেকে চারজনের বেশি প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা করছে না। আমরা বলেছি, আমরা ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল পাঠাব। কেন? এখন কি ওরা ঠিক করবে কার কার সঙ্গে দেখা যাবে? সর্বত্র বিএলও-রা মারা যাচ্ছেন। তাদের দাবি ন্যায়সঙ্গত। ভাবুন, শুধু একটি মিটিংয়ের জন্য তাদের ৪৮ ঘণ্টা বসে থাকতে হয়েছে! (বিএলও-দের উদ্দেশ্যে) আপনারা আত্মহত্যা করবেন না—জীবন খুব মূল্যবান। অথচ ওদের কোনও দয়া নেই—বিএলও-দের কথা শোনার জন্য ৪৮ ঘণ্টা লাগাল! দেখুন, এক ছোটখাটো নেতার (রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক) ঔদ্ধত্য! সব মৃত্যুর রেকর্ড আমাদের কাছে আছে। গুজরাত ও মধ্যপ্রদেশে বিএলও মৃত্যুর দায় কার? সেখানে বিজেপি ক্ষমতায়। তারা এত তাড়াহুড়ো করে এসআইআর চালাচ্ছে কেন? তারা কি সাধু? তারা বিএলও-দের চাকরি কেড়ে নেওয়ার ভয় দেখাচ্ছে। যখন আপনারা অন্যদের ভয় দেখাচ্ছেন—তখন আপনাদের চাকরি বাঁচাবে কে?’
এরপরেই কেন্দ্রের মোদি সরকারের উদ্দেশ্যে খোলা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘একটি কাজ করুন (বিজেপি)—চার কোটি নোটিশ পাঠান, তবুও আমরা আপনাদের বিরুদ্ধে লড়ব! আমার কিছু নেই, কিন্তু আমি ওদের ধিক্কার জানাই—যা ওরা করছে তার জন্য। ওরা দেশকে এত নিচে নামিয়ে দিয়েছে। নিরপেক্ষতা কোথায়? সর্বত্র অন্যায় ও পক্ষপাত। আপনারা আর ক্ষমতায় থাকবেন না। আমি বলে দিচ্ছি—আপনাদের সরকার ২০২৯ সালে পড়ে যাবে। তারও আগে হতে পারে!’