সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
‘বাংলায় কথা বললে কেউ যদি বাংলাদেশি হয়, তা হলে তো সুকান্ত মজুমদারও বাংলাদেশি।’ এভাবেই উত্তর দিনাজপুরে গিয়ে বিজেপি শাসিত মহারাষ্ট্রে বাংলায় কথা বলার অপরাধে বাংলার দেশে সন্দেহে হেনস্থার শিকার ২ বিজেপি কর্মীর সঙ্গে দেখা করে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
বাংলাদেশি সন্দেহে বালুরঘাটের দুই পরিযায়ী শ্রমিককে মহারাষ্ট্রে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছিল। বুধবার বালুরঘাট মহকুমার তপনে ওই পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়িতে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে দেখা করলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গে নিলেন স্থানীয় বিজেপি নেতা পুলক চক্রবর্তীকেও। অভিষেকের পাশে দাঁড়িয়ে ওই দুই পরিযায়ী শ্রমিক জানালেন, তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদকের জন্যই তাঁরা জেল থেকে বার হতে পেরেছেন। তার জন্য অভিষেক ছাড়াও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলকে ধন্যবাদ জানান তাঁরা। দীর্ঘ দিন মহারাষ্ট্রে কাজ করতেন বালুরঘাটের দুই পরিযায়ী শ্রমিক অসিত সরকার এবং গৌতম বর্মণ। গৌতম গঙ্গারামপুর বিধানসভা এলাকার বাসিন্দা। ২০১৯ সালে তিনি বিজেপির বুথ সভাপতি ছিলেন। তাঁর স্ত্রী জানিয়েছেন, স্বামীকে জেলমুক্ত করতে বালুরঘাটের বিজেপি সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন তিনি। তার পরেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। এই সূত্রে সুকান্তকে আক্রমণ করেন অভিষেক। অসিত এবং গৌতমকে দু’পাশে দাঁড় করিয়ে তিনি বলেন, ‘সাত মাস ধরে এঁদের জেলে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছিল। আমরা জানতে পেরে কাঠখড় পুড়িয়ে ফিরিয়ে এনেছি।’ তার পরেই তিনি বলেন, ‘মহারাষ্ট্রে তো বিজেপি, কিন্তু সুকান্ত মজুমদার কিছু করেননি।’
অভিষেকের পাশে দাঁড়িয়ে অসিত এবং গৌতম জানান, তাঁরা প্রায় ২০ বছর মহারাষ্ট্রে কাজ করছেন। কিন্তু বাংলায় কথা বলার জন্য তাঁদের গ্রেফতার করে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পরেই অভিষেক প্রশ্ন তোলেন, ‘বাংলায় কথা বলে এরা সাত মাস জেলে থাকলে সুকান্ত মজুমদার কেন থাকবেন না? এখানে তৃণমূল-বিজেপি কিসের? রাজনীতি করা মানে তো মানুষের পাশে দাঁড়ানো। যাঁরা আপনাকে জিতিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আপনাদের দায়িত্ব, কর্তব্য নেই?’ সুকান্তর উদ্দেশ্যে অভিষেক বলেন যে, ‘জেলার উন্নয়নের জন্য আপনি কী কাজ করেছেন, তা মানুষ জানতে চায়। রিপোর্ট কার্ড প্রকাশ করুন। আপনি শুধু ট্রেনের স্টপেজ তৈরি করতে জানেন। আপনাকে র্যাম্পে হাঁটার জন্য আর ট্রেনের স্টপেজ তৈরি করার জন্য মানুষ ভোট দেয়নি।’
অভিষেক বলেন, ‘সমস্যার কথা শুনলে আমি তাদের পাশে দাঁড়াবো না? গতকাল বীরভূমে গিয়েছিলাম। সোনালি খাতুনের সঙ্গে দেখা করেছি। তার অপরাধ শুধু বাংলায় কথা বলা। তাকে কলকাতা হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে মুক্তি দিতে হয়েছে। একইভাবে মুর্শিদাবাদের ছেলে জুয়েল রানাকে ওড়িশায় পিটিয়ে মারা হয়েছে। ছয় থেকে আট মাসে প্রায় ১২০০ অভিযোগ এসেছে। মানুষের মধ্যে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।’
এসআইআর প্রসঙ্গে
বাংলার ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে বাংলার সাধারণ মানুষকে অকারণে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে অভিষেকের দাবি, ‘বাংলায় জিততে না-পেরে এসআইআরের নামে মানুষকে হেনস্থা করছে।’ বিজেপির উদ্দেশে তাঁর প্রশ্ন, বাংলায় যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁদের কত জন বাংলাদেশি, আর কত জন রোহিঙ্গা?’ এসআইআরের জন্য দু’মাসে ৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানান অভিষেক। তাঁর প্রশ্ন, ‘এই মৃত্যুর দায় কার? বাংলার উপর কিসের এত রাগ বা অবজ্ঞা? বিজেপি বাংলায় নির্বাচনে জিততে পারেনি। এখন ওরা বাংলার গরিব মানুষকে অত্যাচার করছে, তাঁদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে এবং বৃদ্ধ ও অসুস্থদেরও এসআইআর-র ভোগান্তির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। গতকাল নৈহাটিতে এসআইআর শুনানির লাইনে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধা মারা গেছেন। আজ মালদায় এক বিএলও মারা গেছেন। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যুগুলোর দায় কে নেবে? বাংলাকে এত হিংসা কেন? বিজেপি-শাসিত রাজ্য এবং বাংলার জন্য নিয়ম কি আলাদা হতে পারে? বিহারে পরিযায়ী শ্রমিকদের তলব করা হয়নি, অথচ বাংলায় তা হচ্ছে। একই দেশে দু’রকম আইন কীভাবে সম্ভব? সাংবাদিক বন্ধুদের অনুরোধ করব, আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখুন, এসআইআর-এর কারণে যাঁদের মৃত্যু হয়েছে, কোনো বিজেপি নেতা তাঁদের বাড়ি গিয়ে সামান্যতম সাহায্যটুকুও করেছেন কি না। কেন্দ্রীয় সরকার ৩০ লক্ষ মানুষের বাড়ি তৈরির টাকা আটকে রেখেছে। আপনারা যে নতুন রাস্তাঘাট দেখছেন, তা কারা তৈরি করেছে? গত ১১ বছরের শাসনকালে উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের জন্য ওরা কিছুই করেনি। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ‘রাধিকাপুর-আনন্দ বিহার এক্সপ্রেস’-এর পরিষেবা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, আগে যা রোজ চলত, এখন তা সপ্তাহে মাত্র একদিন চলে। উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরে মানুষ আতঙ্কে আত্মহত্যা করছেন। ওছমান মোল্লার পরিবার আমাকে জানিয়েছে, ওরা এমন ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছিল যে তিনি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। বিজেপির চোখে কি অমর্ত্য সেন, দীপক অধিকারী (দেব) এবং মহম্মদ শামিও অনুপ্রবেশকারী? বিজেপির নিজস্ব রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজ তো খোদ প্রধানমন্ত্রী মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি বলে অভিহিত করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন বাংলাদেশের সীমান্ত সুরক্ষিত করা হবে। অথচ তাঁদেরই সাংসদ জগন্নাথ সরকার ভারত ও বাংলাদেশের মাঝখান থেকে সীমান্ত তুলে দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছেন। মানুষ কার কথা বিশ্বাস করবে? আগে নিজেদের মতপার্থক্য মেটান। অনন্ত মহারাজ এবং জগন্নাথ সরকারকে কি কোনো শোকজ করা হয়েছে?’

তৃণমূলের টার্গেট প্রসঙ্গে বলেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমি সবসময়ই চাইব এই অঞ্চলের ৬টি আসনেই আমরা জিতি। প্রতিটি আসন জেতার জন্য আমি লড়াই করব এবং গত ১৫ বছরের কাজের খতিয়ান নিয়ে আমরা ঘরে ঘরে পৌঁছাব। ২০১৯ এবং ২০২৪ সালে বিজেপি এখানে জিতেছে। মানুষকে এবার ঠিক করতে হবে, এখান থেকে বিজেপিকে জিতিয়ে তারা কী পেয়েছেন। বিজেপিকে ভোট দিলে আপনাকে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে জেলে ভরা হবে, আর তৃণমূলকে ভোট দিলে উন্নয়ন হবে। মতুয়ারা জানে বিজেপি তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। বিজেপির সাংসদ ও বিধায়করা বলছেন, ভোটার তালিকা থেকে ২ লক্ষ মতুয়ার নাম বাদ গেলেও নাকি কোনো সমস্যা নেই! বাংলা থেকে বিজেপির ১২ জন সাংসদ আছেন। যদি ভোটাররাই অবৈধ হন, তবে এই সাংসদরা বৈধ হন কী করে? গত ৬ বছরে বিজেপি মতুয়াদের জন্য কী করেছে?’