সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালতের এই নির্দেশের জেরে স্ক্রুটিনির সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের সূচিতে। ফলে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নয়, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হতে পারে মাসের শেষের দিকে—এমনই ইঙ্গিত মিলছে নির্বাচন কমিশন সূত্রে।
সোমবার প্রায় দেড় ঘণ্টার দীর্ঘ শুনানির পর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ায় স্ক্রুটিনির জন্য অতিরিক্ত সাত দিন সময় দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, আগে যেখানে ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যাচাই শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ, নথিপত্র যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার থাকবে ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (ERO) এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের (AERO) হাতেই।
এই প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট আরও পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছে, মাইক্রো অবজার্ভারদের কোনও সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা নেই। তাঁরা শুধুমাত্র পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় থাকবেন, কিন্তু ভোটার তালিকায় নাম রাখা বা বাদ দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন না। আদালতের এই পর্যবেক্ষণ এসআইআর প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সাংবিধানিক কাঠামোর দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্ক্রুটিনির সময় বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে যাচ্ছে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের দিন। আগে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত সূচি অনুযায়ী ১৪ ফেব্রুয়ারিতেই তালিকা প্রকাশের কথা ছিল। কিন্তু নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে শুনানি ও আপত্তি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া। তার পরবর্তী সাত দিন, অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে স্ক্রুটিনি। ফলে ১৪ ফেব্রুয়ারিতে তালিকা প্রকাশ কার্যত অসম্ভব।
এমনকি সোমবার বিকেলে কমিশনের তরফে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ২১ ফেব্রুয়ারিতেও চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ নাও হতে পারে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (CEO) দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, ইআরও-রা নিজেদের স্তরের কাজ শেষ করার পর সেই রিপোর্ট পাঠাবেন জেলা নির্বাচনী আধিকারিকদের (DEO) কাছে। ডিইও-রা সেই কাজ মূল্যায়ন করার পর তা যাবে সিইও দফতরে। সবশেষে সিইও দফতর গোটা প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখে নির্বাচন কমিশনের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাঠাবে। এই বহুস্তরীয় প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পরেই ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে কমিশন। সেই কারণেই ২১ ফেব্রুয়ারির পরেই তালিকা প্রকাশের সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এর আগে দেশের একাধিক রাজ্যে এসআইআর-এর এনুমারেশন পর্বের সময়সীমা বাড়ানো হলেও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। এই বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছিল বিভিন্ন মহল থেকে। সেই আবহেই সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার শুনানি শুরু হয়। সোমবারের শুনানিতে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, এসআইআর প্রক্রিয়ায় কোনও রকম বাধা বরদাস্ত করা হবে না। একই সঙ্গে শীর্ষ আদালত মন্তব্য করে, নির্বাচন কমিশনের কাগজে-কলমে কাজের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির কিছু ফারাক রয়েছে, যা মাথায় রেখেই সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত।
এই শুনানিতে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। এসআইআর সংক্রান্ত মামলায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগতভাবে সওয়াল করা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত পর্যবেক্ষণে বলেন, মুখ্যমন্ত্রীর এই সওয়াল সংবিধানের প্রতি তাঁর আস্থা ও বিশ্বাসেরই প্রকাশ। আদালতের ভাষায়, “এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। বিষয়টিকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই।”

এর আগে অখিল ভারত হিন্দু মহাসভা সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানিয়ে দাবি করেছিল, মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগতভাবে সওয়াল করা সাংবিধানিকভাবে অনুচিত। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতেই সোমবার এই মন্তব্য করে শীর্ষ আদালত, যা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশ পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়াকে যেমন আরও সময় ও সুযোগ দিল, তেমনই ভোটার তালিকা প্রকাশের সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তাও বাড়াল। তবে আদালতের স্পষ্ট বার্তা—প্রক্রিয়া থামবে না, এবং সিদ্ধান্ত হবে সাংবিধানিক নিয়ম মেনেই।