রফিকুল ইসলাম। কলকাতা সারাদিন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকল ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রায় ৩৫ বছর ধরে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে দেশের ক্ষমতার রাজনীতি। ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত এই দুই নেত্রীর প্রভাবেই গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দেশের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ফলে এবার দেশ পেতে চলেছে এক নতুন প্রধানমন্ত্রী—যা শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং একটি যুগের অবসান।
এই নির্বাচনের বিশেষ তাৎপর্য আরও বেড়েছে কারণ নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগকে ভোটে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় হিংসার ঘটনায় দলের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ফলে প্রধান বিরোধী শক্তিকে ছাড়া অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নির্বাচন কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক ও কৌশলগত ভারসাম্যেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ভারত, পাকিস্তান এবং চিন—এই তিন আঞ্চলিক শক্তি অত্যন্ত সতর্কভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
২০২৪ সালের আগস্টে নোবেলজয়ী মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যায়। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পায়। ছাত্র আন্দোলনের পর শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়া, সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ, সীমান্তে বিএসএফ ও বিজিবির মধ্যে উত্তেজনা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় উস্কানিমূলক প্রচার—এসব ইস্যু দুই দেশের সম্পর্ককে স্পর্শকাতর করে তোলে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিকে ঘিরে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দিল্লির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিলিগুড়ি করিডোরের মাধ্যমে সংযুক্ত এই অঞ্চল ভারতের নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকে সংবেদনশীল। ফলে ঢাকার রাজনৈতিক অবস্থান দিল্লির কৌশলগত পরিকল্পনায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের ইঙ্গিত মিলছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। করাচি ও চট্টগ্রামের মধ্যে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে, চালু হয়েছে ঢাকা-করাচি সরাসরি বিমান পরিষেবা। ভিসা প্রক্রিয়া শিথিলকরণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির কথাও আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদ এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে।
চিনের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে গভীর হয়েছে। পরিকাঠামো, বন্দর উন্নয়ন, বিদ্যুৎ প্রকল্প ও প্রযুক্তি খাতে চিনের বিনিয়োগ বেড়েছে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংক্রান্ত চুক্তিও হয়েছে। বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান চিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই নির্বাচনের পর যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী বেইজিং।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক গুরুত্বও এই নির্বাচনের তাৎপর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারতীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চল প্রায় চারদিক থেকে বাংলাদেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী অবস্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌ চলাচলের ক্ষেত্রেও কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। ভারত-চিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে ঢাকার নীতিগত অবস্থান ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা নিতে পারে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রায় ১৩.৫১ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়েছে বলে অনুমান। এর মধ্যে ভারতের রপ্তানি ছিল প্রায় ১১.৪৬ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ২.০৫ বিলিয়ন ডলার। তবে কূটনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাণিজ্য সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ফলাফলের উপর নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কৌশলগত দিকনির্দেশ। যদি একটি শক্তিশালী একক সরকার গঠিত হয়, তাহলে পররাষ্ট্রনীতিতে স্থিরতা আসতে পারে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে। কিন্তু যদি জোট সরকার গঠিত হয়, তাহলে নীতিগত অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, যা আঞ্চলিক সমীকরণে অনিশ্চয়তা বাড়াবে।

সব মিলিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন শুধু বাংলাদেশের ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নতুন প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তাঁর নীতিগত অবস্থান কী হবে এবং কোন কৌশলগত পথে হাঁটবে বাংলাদেশ—এই প্রশ্নগুলির উত্তরই আগামী দিনের আঞ্চলিক রাজনীতির দিকনির্দেশ স্থির করবে।
বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণের পর দেশ কি স্থিতিশীলতা ও সমন্বয়ের পথে হাঁটবে, নাকি নতুন করে কৌশলগত টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে—সেই দিকেই এখন তাকিয়ে গোটা দক্ষিণ এশিয়া।