সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
বাংলার ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরে এসআইআরের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। আর সেই তালিকা থেকে যেন বেছে বেছে বাদ দেওয়া হয়েছে তৃণমূলের টিকিটের বিজয়ী সংখ্যালঘু মুসলিম বিধায়কদের। বাদ দেওয়া হয়েছে তৃণমূলের জেলা ও রাজ্য স্তরের নেতা ও জনপ্রতিনিধিদেরও। এমনকি বিশ্বের দরবারে বাংলা তথা ভারতের মুখ উজ্জ্বল করে বিশ্বকাপ জিতে নিয়ে আসা শিলিগুড়ির মেয়ের পর্যন্ত ভোটার তালিকায় রয়েছে বিচারাধীন বলে। কমিশনের প্রকাশ করা চূড়ান্ত তালিকায় এভাবে বেছে বেছে বাদ দেওয়ার ঘটনা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল।
বিচারাধীন তৃণমূলের ৬ মুসলিম বিধায়ক
জাতীয় নির্বাচন কমিশনের প্রকাশ করা চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে মৃত বলে যেমন বাঁধ গিয়েছে বহু জীবিত ভোটার, থেকে তেমনভাবেই একাধিকবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বিধানসভায় প্রতিনিধিত্ব করা অথবা রাজ্য মন্ত্রিসভায় থাকা মন্ত্রীদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে চূড়ান্ত তালিকা থেকে। এই তালিকায় রয়েছেন, মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরের বিধায়ক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী জাকির হোসেন। জঙ্গিপুরের বিধায়ক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী জাকির হোসেন এর আগে শুনানিতে হাজির হয়েছিলেন। শুনানিতে পাসপোর্ট, সরকারি বন্দুকের লাইসেন্স এবং সচিত্র বিধায়কের পরিচয়পত্র জমা দিয়েছিলেন। মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘির বিধায়ক বাইরন বিশ্বাস এবং তাঁর দুই ভাই। বাইরন বিশ্বাসও শুনানিতে হাজির দিয়েছিলেন। কিন্তু নামের প্রকাশিত তালিকায় দুই বিধায়ককেই বিচারাধীন বা অমীমাংসিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আছেন জলঙ্গীর বিধায়ক আবদুর রাজ্জাক। এছাড়াও বিচারাধীনের তালিকায় রয়েছেন দক্ষিণ দিনাজপুরের কুমারগঞ্জের তৃণমূলের বিধায়ক তোরাফ হোসেন মণ্ডল এবং আমডাঙার বিধায়ক রফিকুর রহমানের নাম।
বিচারাধীন তালিকায় আছেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা হরিশ্চন্দ্রপুরের বিধায়ক তাজমুল। তাঁর দাবি, গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এসআইআরের নোটিস পেয়েছিলেন তিনি। সেই নোটিস হাতে পাওয়ার পরে লাইনে দাঁড়িয়ে সব নথি জমা করেন। তার পরেও বিচারাধীন তালিকায় নাম থাকায় অবাক হয়েছেন তাজমুল। তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই ৬ বিধায়কই সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি! এছাড়াও জঙ্গিপুরের সাংসদ তথা তৃণমূলের সাংগঠনিক জেলা সভাপতি খলিলুর রহমানের পরিবারের সাতজনের নাম বিচারাধীন তালিকায় আছে। বিচারাধীন বা অমীমাংসিত হিসাবে তালিকায় নাম আসায় ক্ষুব্ধ তৃণমূলের বিধায়ক তোরাফ হোসেন মণ্ডল বলেন, পেনশন হোল্ডার আমি। চাকরি করেছি ৩৬ বছর। দু’বারের বিধায়ক। ২০০২ সালের ভোটার তালিকাতেও নাম রয়েছে। এরপরেও বাবার নামের উচ্চারণের সামান্য ভুলে শুনানিতে ডাকা হয়েছিল। সমস্ত নথি জমাও দিয়েছিলাম।
বিচারাধীন বিশ্বকাপ জয়ী-রিচা ঘোষ
কয়েক মাস আগেই বিশ্বের দরবারে বাংলা তথা ভারতের মুখ উজ্জ্বল করে ভারতকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন শিলিগুড়ির মেয়ে রিচা ঘোষ। আশ্চর্যজনকভাবে নির্বাচন কমিশনের প্রকাশ করা চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুসারে তিনিও পাননি ভোটাধিকার। শিলিগুড়ি পুরসভার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রিচা। তাঁর বাবার দাবি, এসআইআর নোটিস পাওয়ার পর অনলাইনে কন্যার সব নথি জমা করেছিলেন। তার পরেও বিচারাধীন তালিকায় রিচার নাম থাকায় অবাকই হয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপ জয়ের পর তিনি বাড়িতে এসেছিলেন। সংবর্ধনায় ভরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। রাজ্য সরকারের তরফে রিচাকে বঙ্গভূষণ সম্মানও প্রদান করা হয়। রিচাকে রাজ্য পুলিশে ডিএসপি পদে চাকরিও দেওয়া হয়েছে। সেই রিচার নাম বিচারাধীন বিভাগে রয়েছে। তাঁর বাবা মানবেন্দ্র ঘোষের দাবি, বছরের বেশিরভাগ সময়ই রাজ্যের বা দেশের বাইরে থাকে রিচা। এসআইআর চলাকালীন তার নামে শুনানির নোটিস জারি হয়েছিল। বিএলও সেই শুনানির নোটিস দিয়ে যান বাড়িতে। শুধু রিচা নন, তাঁর দিদি সোমাশ্রী ঘোষের নামও রয়েছে বিচারাধীন তালিকায়। শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেব এই ঘটনায় ক্ষোভ উগরে বলেন, রিচা শুধু শিলিগুড়ির নয়, ভারতের গর্ব। এটা নির্বাচন কমিশনের খামখেয়ালিপনা। মহান নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার নিন্দা করি।
রাজারহাটের জ্যাংড়ায় বাদ ২৫০ ভোটার
এসআইআরের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পরে দেখা গিয়েছে বহু বৈধ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে রাজারহাট ব্লকের জ্যাংড়া হাতিয়াড়া ২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতেও। এই পঞ্চায়েতে রয়েছে মোট দুটি পার্ট। তার মধ্যে ২৫৬ নম্বর পার্টের মোট ভোটার ৭০১। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ গেছে ১১৫ জনের। আর ২৫৭ নম্বর পার্টের মোট ভোটার ৬০৪, বাদের খাতায় পড়েছে ১৪৯ জন। দুটি পার্ট মিলিয়ে ভোটাধিকার হারিয়েছেন প্রায় ২৫০ জন। এসআইআরের তালিকা হাতে পাওয়ার পরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন এলাকার সাধারণ মানুষ। জেলা পরিষদ সদস্য মহম্মদ আফতাবুদ্দিনের অফিসের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখান তাঁরা। এমনকি ওই বিক্ষোভে সামিল হয়েছেন মহম্মদ আফতাব উদ্দীন নিজেও। কারণ তাঁর তিন ভাইয়েরও নামও তালিকায় নেই। নাম বাদ গেছে ২৫৬ পার্টের বিএলও মহম্মদ আক্রাম উদ্দীনেরও। মহম্মদ আফতাব উদ্দীন বলেন, আমার নিজের ৩ ভাইয়ের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির চক্রান্তে বৈধ ভোটারদের তালিকার থেকে নাম কেটে দেওয়া হয়েছে।