প্রিয়াঙ্কা মান্না। কলকাতা সারাদিন।
দুর্গা পুজোর আগেই কলকাতায় যানবাহন ব্যবস্থায় ঐতিহাসিক পরিবর্তন। আজ শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাতে উদ্বোধন হতে চলেছে কলকাতার তিন নতুন মেট্রো প্রকল্পের। হাওড়া থেকে শিয়ালদহ লক্ষ লক্ষ যাত্রী পৌঁছে যেতে পারবেন মাত্র ১১ মিনিটেই। এর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে তিনি ৭.২ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ছয়-লেনের কোনা এক্সপ্রেসওয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে চলেছেন। হাওড়া-কলকাতা করিডোর বরাবর এই উন্নত সড়ক প্রকল্পটি রাজ্যের বাণিজ্য, পর্যটন এবং পরিবহণ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। মোট ১২০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে নির্মিত এই উড়ালপথটি হাওড়া, তার আশেপাশের এলাকা এবং কলকাতার মধ্যে সংযোগ উন্নত করবে। এর ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীর মূল্যবান সময় সাশ্রয় হবে এবং যানজট কমবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রকল্পটি এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এক বিশাল প্রভাব ফেলবে, যা ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে।
আজ শুক্রবার কলকাতায় আসছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। এই দিনেই তিনি তিনটি নতুন মেট্রো লাইনের উদ্বোধন করবেন। কর্মসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী প্রথমে কলকাতা বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে যশোর রোড মেট্রো স্টেশনে পৌঁছাবেন। সেখান থেকেই প্রধানমন্ত্রী গ্রিন লাইনে ২.৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এসপ্ল্যানেড-শিয়ালদহ মেট্রো রুট, ইয়েলো লাইনে ৬.৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ নোয়াপাড়া-জয়হিন্দ বিমানবন্দর পর্যন্ত মেট্রো পরিষেবা এবং অরেঞ্জ লাইনে ৪.৪ কিলোমিটার দীর্ঘ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়-বেলেঘাটা মেট্রো রুটের শুভ সূচনা করবেন। রেল মন্ত্রকের দাবি, এই তিনটি নতুন মেট্রো লাইনের উদ্বোধনের ফলে কলকাতার মেট্রো রুটে যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পাবে। প্রতিদিন প্রায় ৯.১৫ লক্ষ মানুষ উপকৃত হবেন এবং তিনটি লাইনে মিলিয়ে চালু হবে ৩৬৬টি নতুন পরিষেবা।
সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হল গ্রিন লাইন (এসপ্ল্যানেড-শিয়ালদহ) উদ্বোধনের হলে হাওড়া থেকে শিয়ালদা যেতে সময় লাগবে মাত্র ১১ মিনিট। যেটা এখন সড়ক পথে যেতে সময় লাগে ৪০-৪৫ মিনিট। অন্যদিকে, ইয়েলো লাইনের সম্প্রসারণের ফলে বিমানবন্দরে যাতায়াত আরও সহজ হবে। এসপ্ল্যানেড থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এই পথ অতিক্রম করতে লাগবে মাত্র ৩০ মিনিট। অপরদিকে অরেঞ্জ লাইনের সম্প্রসারণও কলকাতার পরিবহনের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনবে।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থেকে বেলেঘাটা পর্যন্ত ৪.৪ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন এই রুট চালু হলে সায়েন্স সিটি, একাধিক হাসপাতাল, স্কুল ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ হবে। এতে যাত্রীসংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কবি সুভাষ থেকে বেলেঘাটা পর্যন্ত যাত্রা সময় কমে দাঁড়াবে মাত্র ৩২ মিনিটে। এই তিনটি নতুন মেট্রো পরিষেবা চালু হলে শুধু কলকাতাই নয়, উত্তর ২৪ পরগনা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার যাত্রীদের যাতায়াতেও বিরাট সুবিধা হবে। আগে যে পথ অতিক্রম করতে ঘন্টার পর ঘন্টা লেগে যেত, এখন সেই একই রুটে যেতে সময় লাগবে মাত্র কয়েক মিনিটেই। নতুন পরিষেবা চালু হলে প্রতিদিন প্রায় ৯ লক্ষ যাত্রী উপকৃত হবেন বলে অনুমান রেলের।
নতুন কোন কোন রুট চালু হচ্ছে?
২২শে আগস্ট, তিনটি নতুন রুটের উদ্বোধন হবে। এই তিনটি রুট হলো শিয়ালদহ-এসপ্ল্যানেড (২.৪৫ কিমি), নোয়াপাড়া-জয় হিন্দ (কলকাতা বিমানবন্দর) (৬.৭৭ কিমি), এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়-বেলেঘাটা (৪.৩৯ কিমি)।
হাওড়া-শিয়ালদহ যুক্ত হওয়ায় গ্রিন লাইনে মোট ১২টি স্টেশন থাকবে, যা হাওড়া থেকে সল্টলেক পর্যন্ত বিস্তৃত। এই স্টেশনগুলো হলো: হাওড়া ময়দান, হাওড়া, মহাকরণ, এসপ্ল্যানেড, শিয়ালদহ, ফুলবাগান, সল্টলেক স্টেডিয়াম, বেঙ্গল কেমিক্যাল, সিটি সেন্টার, সেন্ট্রাল পার্ক, করুণাময়ী এবং সল্টলেক সেক্টর ফাইভ। হাওড়া থেকে শিয়ালদহ পৌঁছতে সময় লাগবে মাত্র ১২ মিনিট।
বিমানবন্দর থেকে মেট্রো পরিষেবা
নোয়াপাড়া-বিমানবন্দর সেকশনটি ইয়েলো লাইন নামে পরিচিত। এর স্টেশনগুলো হলো: নোয়াপাড়া, দমদম ক্যান্টনমেন্ট, যশোর রোড এবং জয় হিন্দ (বিমানবন্দর)। আপাতত বিমানবন্দর থেকে নোয়াপাড়া পর্যন্ত মেট্রো পরিষেবা চালু হচ্ছে। এখান থেকে যাত্রীগণ কবি সুভাষ বা এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত যেতে পারবেন। এই রুটে সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭০ টাকা ধার্য করা হয়েছে।
বিমানবন্দর থেকে বিভিন্ন গন্তব্যের সম্ভাব্য ভাড়া
বিমানবন্দর-যশোর রোড: ৫ টাকা
বিমানবন্দর-দমদম ক্যান্টনমেন্ট: ১০ টাকা
বিমানবন্দর-নোয়াপাড়া: ২০ টাকা
বিমানবন্দর-চাঁদনিচক: ৪০ টাকা
বিমানবন্দর-কবি সুভাষ: ৪৫ টাকা
বিমানবন্দর-রুবি: ৬৫ টাকা
বিমানবন্দর-হাওড়া: ৬০ টাকা
বিমানবন্দর-সেক্টর ৫: ৭০ টাকা

প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি প্রসঙ্গে বঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জানান, প্রধানমন্ত্রী প্রথমে কলকাতা বিমানবন্দর থেকে যশোর রোড মেট্রো স্টেশনে পৌঁছবেন। সেখান থেকেই তিনি মেট্রো পরিষেবার উদ্বোধন করবেন। পরে যশোর রোড থেকে জয়হিন্দ এয়ারপোর্ট মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত মেট্রোয় ভ্রমণ করবেন। এরপর তিনি সড়কপথে দমদম সেন্ট্রাল জেল মাঠে যাবেন, যেখানে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি রয়েছে তাঁর।
অন্যদিকে, ২২ অগস্ট প্রধানমন্ত্রীর বিহার সফরেরও কর্মসূচি রয়েছে। তিনি গয়া জেলায় প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের শিলান্যাস ও উদ্বোধন করবেন। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে এটি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সফর।