রাহুল সিংহ মজুমদার। কলকাতা সারাদিন।
দীর্ঘদিন ধরে নিজের বিবাহিত স্ত্রীর সঙ্গে এক ছাদের নিচে থাকেন না তিনি। দীর্ঘদিন ধরে বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার মেয়েকে নিয়ে এক ছাদের নিচে বসবাস করেন কলকাতার প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়। বছর কয়েক আগে সর্বসমক্ষে মা দুর্গার সামনে বৈশাখীর সিঁথির সিঁদুরে রাঙিয়ে দিলেও তাকে আইনি মান্যতা দিল না আদালত।
শোভন চট্টোপাধ্যায় ও রত্না আইনি বিচ্ছেদে অনুমতি দিল না আদালত। রত্না চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ চেয়ে শোভন চট্টোপাধ্যায়ের করা মামলা খারিজ করে দিল আলিপুর আদালত।
অন্যদিকে, রত্না চট্টোপাধ্যায় একসঙ্গে থাকার জন্য যে আবেদন করেছিলেন, তাও আদালত খারিজ করে দিল। অর্থাৎ আইনি বিচ্ছেদ না হলেও শোভনকে রত্নার সঙ্গে থাকতে হবে, এমন নির্দেশ দিল না আদালত। প্রায় ৮ বছর ধরে চলা ডিভোর্স মামলা এদিন খারিজ করে দিল আদালত। স্ত্রী রত্না চট্টোপাধ্যায়ের থেকে বিবাহবিচ্ছেদ পেলেন না রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা কলকাতার প্রাক্তন মেয়র। ফলে শোভন-বৈশাখীর আইনিভাবে এক হওয়ার রাস্তা ফের বাধাপ্রাপ্ত হল।
২০১৭ সালে বিবাহবিচ্ছেদ চেয়ে আলিপুর আদালতে মামলা করেছিলেন শোভন। রত্নার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেছিলেন। রত্নার বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর আচরণের অভিযোগ তুলে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন জানিয়ে শোভন বলেছিলেন, রত্না নিজের বাচ্চাদের দেখেন না। ক্রুয়েলটি গ্রাউন্ডে ডিভোর্সের মামলাটি করেছিলেন প্রাক্তন মেয়র। স্ত্রী রত্না চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে মারধর, কটূক্তি, মানহানির মতো গুরুতর অভিযোগ এনেছিলেন শোভন। জানিয়েছিলেন রত্নাদেবী নিজের সন্তানদের দেখাশোনা করেন না, টাকা পয়সা তছনছ করেন।
কিন্তু কোনও অভিযোগই আদালতে প্রমাণ করতে পারেননি শোভনের আইনজীবী। অভিযোগগুলি প্রমাণিত না হওয়ায় শোভনের আইনত বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন খারিজ করে দেন আলিপুর আদালতের ফার্স্ট অ্যাডিশনাল ডিস্ট্রিক্ট জজ রাজেশ চক্রবর্তী। অন্যদিকে, রত্না শোভন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঘর করতে চেয়ে আবেদন জানিয়েছিলেন। তাঁর সেই আবেদনও খারিজ করে দিল আদালত। কাউকে একসঙ্গে থাকতে বাধ্য করা যায় না বলে আদালত জানিয়ে দিল।

কিন্তু এমন কোনও অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করতে পারেননি শোভন চট্টোপাধ্যায়। ফলে, আলিপুর নগর ও দায়রা আদালতের প্রথম অতিরিক্ত জেলা বিচারক রাজেশ চক্রবর্তী মামলাটি খারিজ করে দেন।
ওদিকে শোভনের সঙ্গে ঘর করতে চেয়ে পালটা মামলা ঠুকেছিলেন রত্না। সেই মামলাও খারিজ করে দিয়েছেন বিচারক। যুক্তি হিসাবে তিনি বলেন, গত ৮ বছর ধরে এক ছাদের তলায় থাকেন না দুজনে, এখন নতুন করে দাম্পত্য শুরু করা সম্ভব নয়। তাই বিবাহিত হলেও দুজনে সেপারেট থাকবেন।

রত্নার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির পর থেকে কলকাতার প্রাক্তন মেয়র শোভন আর তাঁর নিজের বাড়িতে থাকেন না। দীর্ঘদিন ধরেই বান্ধবী বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর কন্যা মহুলকে নিয়ে একত্রবাস করেন শোভনবাবু। তাঁদের সহবাস নিয়ে কম কটাক্ষ ধেয়ে আসেনি, তবে কোনও কিছুকেই পাত্তা দেননি বৈশাখী-শোভন। বছর খানেক আগে মা দুর্গার সামনে বৈশাখীর সিঁথি সিঁদুরে রাঙিয়েছিলেন শোভন চট্টোপাধ্যায়। তখনও উঠেছিল সমালোচনার ঝড়। নিজের দুই সন্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগ নেই শোভন চট্টোপাধ্যায়, এদিন আদালত রত্নার পক্ষে রায় দেওয়ার পর শোভন-রত্না পুত্র ঋষি স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। একইসঙ্গে সব বিবাদ ভুলে বাবাকে একসঙ্গে থাকার আমন্ত্রণও জানিয়েছে ছেলে। শোভন-রত্নার পুত্র ঋষি চট্টোপাধ্যায় এই রায় শুনে বাবা শোভনের উদ্দেশ্যে বলেন, কাম ব্যাক পাপা। এখনও কিছু খারাপ হয়নি, দেরি হয়নি। বাবা ফিরে এলে আমরা সব ঠিক করে নেব।

অন্যদিকে, এদিন আদালতের রায়ের পর রত্না বলেন, ৮ বছর ধরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি আমার বাচ্চাদের জন্য। বাচ্চাদের উপর মানসিকভাবে যে অত্যাচার করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে আট বছর ধরে লড়াই করেছি। আমার সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি, বাপের বাড়ির লোকজন ও আইনজীবীরা লড়েছেন। আমি বিশ্বাস করি। আমাদের এই রায়টা সমাজের উপর প্রতিফলিত হবে। কারণ, পুরুষশাসিত সমাজে মহিলারা যেভাবে নির্যাতিত হন এবং ক্ষমতার কাছে হেরে যান। সেখানে আমি এই লড়াই লড়তে পেরেছি।