শোভন গায়েন। কলকাতা সারাদিন।
“রাত ১টার সময় আগুন লাগে, অথচ দমকল আসে ভোর ৪টেয়। মুখ্যমন্ত্রী সব জানতেন, কিন্তু আগুন নেভাতে নয়, পুলিশ ও দমকলকে বলেছেন ঘর ভাঙতে।” খিদিরপুরের অগ্নিদগ্ধ মার্কেটে গিয়ে এমন বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিদর্শনের ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই পুড়ে যাওয়া খিদিরপুর মার্কেটে পৌঁছালেন রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। সঙ্গে ছিলেন বিজেপি নেতা রাকেশ সিং এবং অর্জুন সিং। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সামনে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু এই অগ্নিকাণ্ডকে নিছক দুর্ঘটনা মানতে নারাজ। খিদিরপুরে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বললেন, “আমি জমি রক্ষা আন্দোলনে ডক্টরেট।” বললেন, “রাত ১টায় আগুন, ভোর চারটেয় কেন দমকল? প্ল্যানিংটা বুঝছেন তো?”
রবিবার রাতের এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পিছনে কোনও দূরভিসন্ধি থাকতে পারে বলে জোরালো ইঙ্গিত দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের তিনি পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যদি তাঁরা হকের দাবিতে আন্দোলনে নামেন, তবে বিজেপি তাঁদের সঙ্গেই থাকবে।
মঙ্গলবার খিদিরপুরে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী দৃঢ়ভাবে দাবি করেন যে, এই ঘটনার নেপথ্যে এক গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে। রাজ্য সরকারকে নিশানা করে শুভেন্দু বলেন, “আলিপুর সেন্ট্রাল জেল, চিড়িয়াখানা সব বিক্রি করে দিচ্ছে সরকার। আর যেখানে আগুন লাগছে, সেখানেই পরদিন মুখ্যমন্ত্রী বলেন জায়গা ঠিক হয়েছে, এক লাখ টাকা দিলাম।” কিন্তু পরে ওই জমিতে গড়ে উঠছে শপিং মল আর বিউটি পার্লার। গরিব মানুষদের তাড়িয়ে দিয়ে টাকা কামানোর বন্দোবস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ শুভেন্দুর। তার কটাক্ষ, “খিদিরপুরের জমি বেচে দিয়েছে সরকার।”
তৃণমূলকে কটাক্ষ করে শুভেন্দুর সাফ কথা, “এটা আর রাজনৈতিক দল নয়, এখন পুরোপুরি টাকা মারার কোম্পানি হয়ে গিয়েছে। কলকাতার দামি জায়গাগুলিতে আগুন লাগিয়ে জমি দখলের খেলা চলছে।” মুখ্যমন্ত্রীকে নিশানা করে তিনি বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী সবাইকে বলেন আমি বাংলার মেয়ে। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন তাঁকে হাজার পুলিশ দিয়ে গরিব ব্যবসায়ীদের ধমকাতে হয়? তিনি আসলে ববি হাকিমদের মুখ্যমন্ত্রী, সাধারণ মানুষের নয়।” বগটুই থেকে ঢাকুরিয়া পর্যন্ত প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডকেই সরকার ব্যর্থ বলেই দাবি করেছেন শুভেন্দু।
তিনি আরও বলেন, “রাজ্যের সিস্টেম সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। প্রশাসন নীরব। জমি ও গরিব ব্যবসায়ীদের জীবিকা রক্ষার কোনও সরকারি উদ্যোগ নেই। টালিগঞ্জ-ঢাকুরিয়ার মতো জায়গাও বেচে দেওয়া হচ্ছে। চারদিকে শুধু শপিং মল, ফ্ল্যাট, আর গরিবের উচ্ছেদ।”
প্রসঙ্গত, সোমবারই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ১ লক্ষ টাকা এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্তদের ৫০ হাজার টাকা করে কাঁচামাল কেনার জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। সেই সঙ্গে তাদের জন্য বিকল্প জায়গায় আপৎকালীন দোকান করে দেওয়ার কথাও বলেন। তবে এই আশ্বাসে ব্যবসায়ীদের একাংশ সন্তুষ্ট হতে পারেননি এবং তারা ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। শুভেন্দু সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে বলেন, “আমরা সবাই একসঙ্গে আপনাদের সঙ্গে লড়াইয়ে শামিল হতে প্রস্তুত। প্রশাসন যদি ঘর-দোকান ভাঙতে আসে, আপনারা ভাঙতে দেবেন না।” রাতের গভীরে আগুন লাগার পরও কেন দমকল দেরিতে পৌঁছল, সেই প্রশ্ন তুলে শুভেন্দু বোঝাতে চান, এই দেরির পিছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুভেন্দুর এই প্রশ্ন যথেষ্টই ইঙ্গিতপূর্ণ।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা যাতে কোনোভাবেই নিজেদের জায়গা না ছাড়েন, সেকথা বারবার এদিন বুঝিয়ে যান শুভেন্দু।
এর আগে সিপিএমও এই ঘটনাকে ‘ম্যান মেড অগ্নিকাণ্ড’ বা মানবসৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড বলে তত্ত্ব খাড়া করেছিল। এবার বিজেপিও একই দিকে ইঙ্গিত দেওয়ায় খিদিরপুর মার্কেটের অগ্নিকাণ্ড নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও তীব্র হলো। এই ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং এর ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে জনমনে বাড়ছে কৌতূহল।
