সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘ছাব্বিশের পর তো কেন্দ্রে এই সরকারও থাকবে না।’ মঙ্গলবার নবান্ন থেকে এভাবে ট্রেনের মোদি সরকারের স্থায়িত্ব নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেস সংবিধান মেনে চলে। ছাব্বিশের পর তো কেন্দ্রে এই সরকারও থাকবে না। এখন থেকে বলছি খোঁজ রাখুন। অনেক ঘটনা ঘটে গিয়েছে, আমরা মুখ খুলিনি। ভদ্রতা করেছি। পার্লামেন্ট চালাতে দিয়েছি। তৃণমূল গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। কিন্তু কেউ যদি মানুষের অধিকার কেড়ে নিতে চায়। নির্বাচন প্রক্রিয়াকে নির্বাচনের আগেই শেষ করতে চায়। আমায় আঘাত করলে, আমি প্রত্যাঘাত করব। আমি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড প্রচার করব। যদিও আমি নিজের দেশকে ভালবাসি।’
তুঘলকি কমিশন
মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানান, ভোটার তালিকা থেকে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। বিহার ও বাংলার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দ্বিমুখী নীতির প্রশ্ন তুলে তিনি একে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিপন্থী বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘তুঘলকি কমিশনের একজন বিজেপি কন্যা এআই করে ভোটার বাতিল করে দিলেন ৫৮ লক্ষ ভোটারকে। অনেক আসল ভোটারআছে। দু’নম্বরি চলছে। কোন ভোটার অ্যাকসেপটেট হয়ে জানা গেল না। জোচ্চুরি করার কাজ চলছে। ১৪ তারিখে কেউ মারা গেলে ১৬ তারিখে এসে চিকিৎসক কী দেখবে ? জ্যান্ত মানুষ না চিতা? ওরা সুপ্রিম কোর্টের অর্ডারও মানেনি। বিহারে যদি অ্যালাও হয়, তাহলে এখানেও বললেন হিয়ারিং হবে। তাহলে ১৪ তারিখও শুনানি হওয়ার কথা ছিল। ওই দিন তিনটে নাগাদ কেন ব্লক করে দিলেন? লক্ষ মানুষের নাম আটকে গেল। টর্চার কমিশন। যাঁরা তুঘলকি কাণ্ড করছেন, হিটলারি অত্যাচার চালাচ্ছেন। তাঁদের কাছে প্রশ্ন, ভোট দিয়ে জনগণ সরকার নির্বাচন করেন? নাকি তুঘলকি কমিশন পার্টির হয়ে ভোটটা করে দেন। হরিয়ানা নিয়ে অভিযোগ ছিল। এটা সত্য। বিহার-মহারাষ্ট্রে ছিল। আমার কথা বিহারে যে ডকুমেন্টস অ্যালাও হল, সেটি কেন এখানে হবে না। কেন বাংলা টার্গেট? বিহারে কী কী অ্যালাও করা হয়েছিল? বিহারে কী কী অ্যালাও করা হয়েছিল? ১১ টা ছিল। আমাদের এখানে ১৩ টা করেছে। একটা দুটো। এই তেরোটার মধ্যে বলছি। আমি সব কটা বলছি না। কিছু কিছু বলছি। ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিস সব ছিল। থ্রেটনিং কালচার। আমরা আইন নিশ্চয়ই মানব। যেটুকু কমিশনের আইন / তুঘলকি কমিশনের নিশ্চই মানব। কিন্তু বাউন্ডারির বাইরে গেলে ছক্কা খেতে হবে জনগণের। জানেন এখনও পর্যন্ত কত নাম উঠেছে? এখনও মাইনরিটি-তপশিলী-গরীব মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছে, গরিব লোক খুঁজছে। সব ধর্মের লোক আছে। লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে মেয়েদের অধিকার কাড়ছে। ইয়ং জেনারেশনকে সুযোগই দিলেন না। ২৪ বছর সময় পেলেন হাতে। কেন আগে থেকে এসআইআর শুরু করলেন না? পুজো, বড়দিনের সময় এই সব করলেন। তুঘলকি কমিশন দিল্লির জমিদারের কথায়…ভাবছেন ওই চেয়ারটা পারমানেন্ট। ডোন্ট কেয়ার মনোভাব দেখিয়ে গেছে। একজন বিএলও মৃত্যুর আগে সুইসাইড নোট লিখে গেছে। ইআরও-র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে কমিশন বিরুদ্ধে নয় কেন? ডিএম দের বলছে চাকরি থাকবে না।
আপনাদের চাকরি থাকবে তো? কমিশনের সকলকে বলছি না। আমি মহম্মদ বিন তুঘলককে বলছি। আমি জেলে যেতে প্রস্তুত। ওর মেরে ফেলুক। কিন্তু আমি সারেন্ডার করব না। আমি উৎসর্গ করব মানুষের জন্য। কিন্তু আমি ওদের বিরুদ্ধে লড়াই করব।’ সেই সঙ্গে জাতীয় নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপির সঙ্গে আঁতাত করে যে সমস্ত আধিকারিক বাংলার ভোটারদের নাম অনায্যভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছে তাদের উদ্দেশ্য হুঁশিয়ারি দিয়ে মমতা বলেন, ‘আপনাদের ইতিহাস / ভূগোল/ পলিটিক্যাল সায়েন্স থেকে সবকিছু আছে। অনেক কীর্তি কেলেঙ্কারির নায়ক-নায়িকাদের বলব জণগনের উপর নেবেন না । আপনাদের প্রতিশোধ আমার উপর নিন। জনগণের উপর নয়। আপনারা কেউ ৪২০ ভোল্ট হন। আমি ৪৪০ ভোল্ট। বাজারে মাছ-মাংস বিক্রি হবে না। যে বিজেপির জন্য এত লড়াই করছেন, এখানে এলে তো মাছ-মাংস বন্ধ করে দেবেন। সবাই কি শপিং মলে মাছ-মাংস বেচবে?আমাদের তো চাষিরা রাস্তায় বসে। পুকুরের টাটকা ফল বেচে। স্কন্ধ কাটার রাজনীতি চলছে। এই রাজনীতিকে ধিক্কার জানাই।’
বাংলাদেশে কী শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হল!
ভারতের নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করতে গিয়ে বাংলাদেশের ভোটকে সার্টিফিকেট দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দাবি করলেন যে বাংলাদেশের নির্বাচন মারাত্মক হিংসা ছড়াবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। কিন্তু শান্তিপূর্ণভাবেই বাংলাদেশে নির্বাচন হয়েছে। সেখানে ভারতের গণতন্ত্রকে নির্বাচন কমিশন ধ্বংস করছে বলে দাবি করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। মঙ্গলবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে মমতা বলেন, ‘ওদের দেখা উচিত। গত কয়েকদিন আগেই বাংলাদেশে নির্বাচন হল। সকলেই ভেবেছিলেন যে হিংসা হবে, এটা হবে, সেটা হবে। কিন্তু দেখুন, ওরা কীভাবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে নির্বাচন করেছে। আর গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারতে লজ্জাজনক বিষয়। তুঘলকি কমিশন। গণতন্ত্রকে শেষ করে দিচ্ছে আপনাদের থ্রেট কালচার। আপনারা গণতন্ত্রকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন। গণতন্ত্রকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। গণতন্ত্রকে খতম করার চক্রান্ত। রাজতন্ত্রও কোনওদিন এ জিনিস করেনি। তুঘলকি রাজেও এ জিনিস হয়নি। সুপার তুঘলকি রাজ চলছে। সুপার হিটলার হয়ে গিয়েছে।’
‘যাঁদের ডিমোশন করবে, তাঁদের প্রোমোশন করব’
রাজ্যকে এড়িয়ে নির্বাচন কমিশন সাত এইআরও-কে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এভাবে কি রাজ্য সরকারের কোনও কর্মীকে সরাসরি কমিশন শাস্তি দিতে পারে? মঙ্গলবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে এই একই প্রশ্ন তুলে ক্ষোভ উগরে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচন কমিশনকে ‘ওয়ান পার্টি, ওয়ান তুঘলকি কমিশন’ বলে তোপ দাগেন তিনি। এদিকে, কমিশনের নির্দেশমতো রাজ্যের চার আধিকারিকের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। ওই চারজনের মধ্যে দুই ইআরও (ডব্লিউবিসিএস এগজিকিউটিভ অফিসার) এবং বাকি দু’জন এইআরও।
মমতা বলেন, ‘বিএলও , ডিএম, ইআরওদের ভয় দেখানো হচ্ছে। রাজ্যের এক্তিয়ারে হস্তক্ষেপ করছে কমিশন। দিল্লির জমিদারদের কথায় চলছে তুঘলকি কমিশন। রাজনীতির নামে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হচ্ছে।’ কমিশনের কাছে মমতার আর্জি, ‘গণতন্ত্র মেনে কাজ করুন। গায়ে নেই কম্বল, কবিতার ভাষায় ভোম্বল, এটা একটা প্রবাদ।’ মমতার স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, ‘যাঁদের ডিমোশন করবে, তাঁদের আমরা প্রোমোশন দেব।’ এদিন আধিকারিকদের বিরুদ্ধে এফআইআর প্রসঙ্গেও মুখ খোলেন মমতা। শুধুমাত্র সৌজন্যের কথা মাথায় রেখে আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেই জানান তিনি।