নির্ধারিত সীমার বেশি ভিড়, যানজট ও আদালতের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগ—রাজ্যের রিপোর্টে অসন্তোষ প্রকাশ করে সতর্ক করল কলকাতা হাইকোর্ট।
সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
২১ জুলাইয়ের (21 July Martyrs’ Day) সভা শেষ হলেও তার রেশ কাটেনি এখনও। এবার সেই সভাকে কেন্দ্র করেই কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court) থেকে এল কড়া সতর্কবার্তা। আদালতের শর্ত মেনে সভা না করার অভিযোগে কালীঘাট তৃণমূল (Kalighat Trinamool Congress)-কে ভবিষ্যতের জন্য স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিল আদালত।
শুক্রবার বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য (Justice Sougata Bhattacharya)-র এজলাসে এই মামলার শুনানিতে রাজ্য সরকারের রিপোর্ট জমা পড়ে। সেই রিপোর্টে দাবি করা হয়, আদালতের বেঁধে দেওয়া একাধিক শর্ত বাস্তবে মানা হয়নি। বিশেষ করে সভাস্থলে নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি মানুষের উপস্থিতি ছিল বলে জানানো হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২১ জুলাইয়ের সভাকে ঘিরে। প্রথমে কলকাতা পুলিশ (Kolkata Police) এই কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি। এরপর আয়োজকদের পক্ষ থেকে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হওয়া হয়। শুনানির পর আদালত কয়েকটি নির্দিষ্ট শর্তে সভা করার অনুমতি দেয়।
আদালতের নির্দেশ ছিল, বিড়লা তারামণ্ডল (Birla Planetarium)-এর সামনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সভা করা যাবে এবং জমায়েতের সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি হওয়া চলবে না। পাশাপাশি অন্তত একটি দিকের রাস্তা যান চলাচলের জন্য খোলা রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু রাজ্য সরকারের রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, বাস্তবে সেই শর্তগুলি পুরোপুরি মানা হয়নি। সভায় নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি মানুষের উপস্থিতির কারণে ক্যাথিড্রাল রোড (Cathedral Road)-এর দুই দিকেই যান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যানজটের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও আয়োজকদের পক্ষ থেকে আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল। এর জেরেই সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছিল বলে দাবি রাজ্যের।
এই রিপোর্ট দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য স্পষ্ট বার্তা দেন, ভবিষ্যতে আদালতের নির্দেশ অমান্য করা হলে বিষয়টি হালকাভাবে দেখা হবে না। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিচার বিভাগের নির্দেশ মেনে চলা প্রত্যেক সংগঠন ও আয়োজকের দায়িত্ব।
যদিও এই শুনানিতে আদালত কোনও তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক নির্দেশ দেয়নি, তবে ভবিষ্যতের জন্য কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত স্পষ্ট। আদালতের বক্তব্য, একই ধরনের ঘটনা আবার ঘটলে আরও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। কারণ, ২১ জুলাইয়ের সভা রাজ্যের অন্যতম বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে পরিচিত। ফলে আদালতের এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলির সভা-সমাবেশ আয়োজনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে সভা-সমাবেশের অনুমতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই আদালতের নির্ধারিত শর্ত মেনে জনস্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। এই ভারসাম্য বজায় রাখাই প্রশাসন ও আয়োজকদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
এখন নজর ভবিষ্যতের দিকে। আদালতের এই কড়া বার্তার পর রাজনৈতিক দলগুলি কি আরও সতর্ক হবে? নাকি বড় জনসমাবেশ ঘিরে আবারও উঠবে নির্দেশ লঙ্ঘনের অভিযোগ?
২১ জুলাইয়ের সভা নিয়ে আদালতের এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য নতুন বার্তা দিল। এবার প্রশ্ন একটাই—পরের বড় সমাবেশে আদালতের নির্দেশ কতটা অক্ষরে অক্ষরে মানা হবে?