একসময় বিতর্কের জেরে ছাড়তে হয়েছিল প্রিয় শহর। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ফের কলকাতার মাটিতে পা রাখতেই উলুধ্বনি-শঙ্খধ্বনিতে অভ্যর্থনা, নতুন করে শুরু কি তসলিমার কলকাতা অধ্যায়?
সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
প্রায় দুই দশকের অপেক্ষার অবসান। যে শহরকে একদিন চোখের জলে বিদায় জানাতে হয়েছিল, সেই কলকাতা (Kolkata)-তেই অবশেষে ফিরলেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasrin)। বিমানবন্দরে পা রাখার মুহূর্তেই যেন আবেগ আর রাজনীতির এক অন্য ছবি ধরা পড়ল। লাল পাড়-সাদা শাড়িতে হাসিমুখে বেরিয়ে আসা তসলিমাকে স্বাগত জানানো হল শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে।
কলকাতায় ফেরার আগে থেকেই নিজের উচ্ছ্বাস গোপন করেননি তসলিমা। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন, “আজি এ প্রভাতে কলকাতার অভিমুখে যাত্রা শুরু করিলাম।” সেই পোস্ট ঘিরেই তৈরি হয়েছিল জল্পনা। অবশেষে ৩১ জুলাই সেই জল্পনার অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘ ১৯ বছর পর প্রিয় শহরে ফিরলেন তিনি।
বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় তসলিমা বলেন, “খুবই ভালো লাগছে। সবাইকে ধন্যবাদ।” ছোট্ট এই মন্তব্যেই যেন ধরা পড়ল দীর্ঘ প্রতীক্ষার আবেগ।
এই প্রত্যাবর্তন শুধুই একজন লেখকের শহরে ফেরা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের ইতিহাসও। বাংলাদেশ (Bangladesh) ছাড়ার পর একসময় কলকাতাই ছিল তাঁর আশ্রয়। কিন্তু ২০০৭ সালে তাঁর বইকে ঘিরে বিতর্ক এবং নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে তাঁকে কলকাতা ছাড়তে হয়। এরপর দীর্ঘ সময় দিল্লিতেই কাটাতে হয়েছে তাঁকে।
রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই তসলিমাকে কলকাতায় ফেরানোর দাবি নতুন করে জোরালো হতে শুরু করে। চলতি বছরের মার্চ মাসে সংসদের জিরো আওয়ারে শমীক ভট্টাচার্য (Shamik Bhattacharya) বলেন, “তসলিমা কলকাতাকে ভালোবাসেন। তিনি বাংলায় থাকতে, বাংলায় লিখতে চান। তাঁকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিয়ে কলকাতায় ফিরিয়ে আনা উচিত।” সেই বক্তব্যের পর থেকেই প্রশাসনিক স্তরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে তসলিমার ভারতে থাকার অনুমতির মেয়াদও বাড়ানো হয়। পাশাপাশি তাঁকে জানানো হয়, ভারতের যে কোনও জায়গায় তিনি যেতে পারবেন। সেই সিদ্ধান্তের পরই কার্যত কলকাতায় ফেরার পথ খুলে যায় তাঁর।
তসলিমার এই সফরের অন্যতম আকর্ষণ তাঁর নতুন বই প্রকাশ অনুষ্ঠান। শনিবার রবীন্দ্রসদন (Rabindra Sadan)-এ প্রকাশিত হতে চলেছে তাঁর আত্মজীবনী সমগ্র। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)-র। ফলে সাহিত্য ও রাজনীতি—দুই ক্ষেত্রেই এই অনুষ্ঠান ঘিরে বাড়ছে আগ্রহ।
তসলিমার প্রত্যাবর্তন নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় (Shirshendu Mukhopadhyay)। তাঁর কথায়, “খুবই ভালো লাগছে। দেখা হলে আরও ভালো লাগবে।” সাহিত্য মহলের একাংশও মনে করছে, দীর্ঘ বিরতির পর কলকাতায় তসলিমার উপস্থিতি বাংলা সাহিত্যচর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
তবে এই প্রত্যাবর্তনের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও শুরু হয়েছে আলোচনা। একসময় যে লেখিকাকে নিরাপত্তার কারণে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল, আজ তাঁর ফিরে আসা বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ। অন্যদিকে বিরোধীরা এই বিষয়টিকে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখছেন।
সব মিলিয়ে তসলিমা নাসরিনের কলকাতা ফেরা এখন শুধু সাহিত্যজগতের খবর নয়, রাজ্যের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরেও এটি অন্যতম আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। আগামী দিনের কর্মসূচি, বই প্রকাশ অনুষ্ঠান এবং তাঁর ভবিষ্যৎ অবস্থান—সবকিছুই এখন কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।
প্রায় দুই দশক পর এই প্রত্যাবর্তন কি শুধুই একটি সফর, নাকি কলকাতার সঙ্গে তসলিমা নাসরিনের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা? সেই উত্তরই এখন খুঁজছে বাংলা।