শোভন গায়েন। কলকাতা সারাদিন।
বছর ঘুরলেই বাংলায় বিধানসভা নির্বাচন। তবে তার আগেই একের পর এক কেন্দ্রীয় এজেন্সির পাশাপাশি এবারে বাংলার রাজনীতিতে চাপানউতোর শুরু হলো সেনাবাহিনীকে নিয়ে। সোমবার গান্ধী মূর্তির পাদদেশে তৃণমূলের অবস্থান মঞ্চ অনুমতির মেয়াদ বেরিয়ে যাওয়ায় ভেঙে দিয়েছিল সেনাবাহিনীর জওয়ানরা। নবান্ন থেকে ছুটে এসে বিজেপির বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে সামনে রেখে রাজনীতি করার বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
আর এই বিষয় নিয়েই মঙ্গলবার সকাল থেকে উত্তাল হয়ে উঠল রাজ্য বিধানসভা। অধ্যক্ষ সাসপেন্ড করলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে। ৪ সেপ্টেম্বর বিধানসভার বিশেষ অধিবেশনের শেষ দিন। নিয়ম না মেনে তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়েছে বলে বাইরে এসে অভিযোগ তোলেন শুভেন্দু অধিকারী।
ঘটনার সূত্রপাত হয় সোমবার, যখন ভারতীয় সেনাবাহিনী কলকাতার মেয়ো রোডে তৃণমূলের একটি ধর্নামঞ্চ সরিয়ে দেয়। সেই খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপি সরকার সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে রাজনীতি করছে, কিন্তু তিনি সেনার অবমাননা করছেন না। যদিও এরপর থেকেই তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে সেনা-প্রসঙ্গ নিয়ে ঠান্ডা লড়াই চলতে থাকে। বিজেপি পাল্টা অভিযোগ করে, তৃণমূল মুখ্যমন্ত্রী আদতে সেনাকে অপমান করেছেন। তাদের দাবি, সেনাবাহিনী বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তৃণমূল মঞ্চটি সরায়নি, তাই বাধ্য হয়েই জওয়ানদের পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। মঙ্গলবার বিধানসভায় সেই একই বিষয় নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু অধিবেশনের মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে অপমান করেছেন। ব্রাত্য বসু নাকি বাংলাদেশের সামরিক অভ্যুত্থানের সঙ্গে ভারতীয় সেনার তুলনা টেনেছেন। এর প্রতিবাদেই শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভার ভিতরে ‘ইন্ডিয়ান আর্মি জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেন। তিনি স্পিকারের কাছে শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্যটি কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ারও অনুরোধ করেন।
শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের দাবিকে গুরুত্ব দেননি এবং মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের কথায় তাকে সাসপেন্ড করেন। বিধানসভার বাইরে বেরিয়ে এসে শুভেন্দু বলেন, আজ ব্রাত্য বসু যখন ভারতীয় সেনাকে অপমান করেন, তাদের গায়ে রাজনীতির ছোঁয়া লাগান এবং বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থানের সঙ্গে ভারতীয় সেনার তুলনা করেন গতকাল অবৈধ ছাবড়া ভাঙা নিয়ে, আমরা ভারতীয় সেনা জিন্দাবাদ, হিন্দুস্তান জিন্দাবাদ, ভারতীয় সেনার অপমান মানছি না মানব না…এবং ভারতীয় সেনা সম্পর্কে ওঁর বক্তব্য বিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি করেছিলাম।
অরূপ বিশ্বাসের নির্দেশে এই স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়…অরূপ বিশ্বাসের কথায় অফিসিয়াল প্রস্তাব না এনে তাঁর চেয়ার থেকে তিনি বিরোধী দলনেতাকে সাসপেন্ড করেন। আমি গর্বিত যে, রামপুরহাটের বগটুইতে মুসলমান মহিলা-শিশু পোড়ানোর জন্য প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমাকে সাসপেন্ড করেছিল। পরবর্তীকালে দেবীদুর্গার মূর্তি ভাঙা নিয়ে আমাকে সাসপেন্ড করেছিল। আজ ভারতীয় সেনার হয়ে বলার জন্য, ভারতীয় সেনাকে অপমান এবং রাজনীতিকরণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার জন্য বিরোধী দলনেতাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। আমি গর্বিত ভারতীয়, আমি আমার সেনার জন্য গর্ব অনুভব করি এবং তৃণমূল পাকিস্তানের দালাল।
যদিও বিরোধী দলনেতার অভিযোগ উড়িয়ে ব্রাত্য বসু বলেন, ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, খান সেনার দল ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে নিরীহ সাধারণ নিজের রাষ্ট্রের বাঙালির উপর গুলি চালিয়েছিল কি চালায়নি ? ইতিহাসকে কি মুছে ফেলতে পারি নাকি ? ইতিহাসকে আমরা মুছে ফেলতে পারি না। যা সত্য তা সত্য। ‘৭১ সালের ২৫ মার্চের পর সেই দিনটা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের দাবি আরও জোরাল, আরও পাকাপোক্ত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ঘটনার জন্য আমি যদি পাকিস্তান সেনার নিন্দা করে থাকি, আমি বেশ করেছি। আবার করব। পাকিস্তান সেনা সেদিন যেটা চালিয়েছিল, একটা বর্বর, অমানুষিক ঘটনা। পাকিস্তান সেনাকে নিন্দা করব না তো কী করব ‘৭১ সালের ঘটনায় ?