সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
বলিউডে রোমান্টিক গানের সমার্থক নাম অরিজিৎ সিং। সেই অরিজিৎই সিনেমার প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে অবসর নেওয়ার ঘোষণা করলেন। মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি, নিজের ব্যক্তিগত এক্স (প্রাক্তন টুইটার) অ্যাকাউন্টে একটি আবেগঘন পোস্টের মাধ্যমে এই চমকপ্রদ সিদ্ধান্তের কথা জানান ৩৮ বছর বয়সী শিল্পী।
ব্যাটল অফ গালওয়ান ছবির সাম্প্রতিক গান ‘মাত্রুভূমি’ মুক্তির কয়েকদিন পরেই তাঁর এই ঘোষণা নতুন করে আলোড়ন ফেলেছে সংগীত মহলে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টে অরিজিৎ লেখেন, “নতুন বছরের শুভেচ্ছা সকলকে। শ্রোতা হিসাবে এত বছর ধরে আমায় এত ভালবাসা দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। তবে আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি, এ বার থেকে আমি আর প্লেব্যাক গায়ক হিসাবে কোনও কাজ করব না। আমি প্লেব্যাক গাওয়া বন্ধ করলাম।” অরিজিতের এই ঘোষণায় স্তম্ভিত তাঁর অনুরাগীরা। তবে ঠিক কী কারণে এই ঘোষণা করলেন গায়ক, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সব শেষে তিনি লিখেছেন, “এই সফর সত্যিই সুন্দর ছিল।”
ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে অরিজিৎ আরও বলেন, “ঈশ্বর আমার প্রতি অত্যন্ত সদয় ছিলেন। আমি ভাল মিউজিকের অনুরাগী। ভবিষ্যতে একজন সামান্য শিল্পী হিসেবে আরও নতুন কিছু শেখার এবং ব্যক্তিগতভাবে কিছু করার চেষ্টা করব। আপনাদের সমর্থনের জন্য আবারও ধন্যবাদ। তবে আগের কিছু কাজ এখনও বাকি আছে, সেগুলো শেষ করব। তাই এই বছর হয়তো আমার আরও কিছু গান মুক্তি পেতে পারে। আমি স্পষ্ট করে দিতে চাই যে, গান তৈরি করা আমি বন্ধ করছি না।”
উল্লেখযোগ্যভাবে, অরিজিতের কোনও অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্ট না থাকায় তাঁর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকেই এই ঘোষণা করা হয়েছে। এই পোস্ট প্রকাশ্যে আসার পরেই অনুরাগীদের মধ্যে আবেগের ঢেউ বয়ে যায়। অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ কেউ এই সাহসী সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়েছেন।
২০১৩ সালে আদিত্য রায় কাপুর ও শ্রদ্ধা কাপুর অভিনীত ‘আশিকি ২’-এর কালজয়ী গান ‘তুম হি হো’ দিয়ে রাতারাতি তারকাখ্যাতি পান অরিজিৎ। তাঁর আগে বাংলায় বোঝেনা সে বোঝেনা দিয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। এরপর একের পর এক চার্টবাস্টার গান তাঁকে বলিউডের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কণ্ঠে পরিণত করে। ‘এ দিল হ্যায় মুশকিল’-এর টাইটেল ট্র্যাক, ‘হাওয়াইন’, ‘আপনা বানা লে’, ‘সাজনি’, ‘ভে মাহী’, ‘গেহরা হুয়া’, কিংবা সাম্প্রতিক ‘ঘর কাব আওগে’- প্রতিটি গানেই নিজের স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন তিনি।
তবে এত সাফল্যের পরেও পারিশ্রমিক নিয়ে কোনও রকম দাবি-দাওয়া নেই অরিজিতের। এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন, সিনেমার প্লেব্যাকের জন্য তিনি নির্দিষ্ট কোনও পারিশ্রমিক চার্জ করেন না। নির্মাতারা যা উপযুক্ত মনে করেন, সেটাই তিনি গ্রহণ করেন। লাইভ কনসার্টের ক্ষেত্রেও কত টাকা নেওয়া হয়, সে বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট ধারণা নেই বলেই জানিয়েছেন, কারণ এই বিষয়টি দেখভাল করেন তাঁর ম্যানেজার। অর্থের বিষয়টি নিয়ে তাই খুব একটা ভাবিত নন তিনি। যদিও বলিউডের অন্দরে কান পাতলে শোনা যায়, প্রতি ছবির গানের জন্য অরিজিতের পারিশ্রমিক ১৮ থেকে ২০ লক্ষ টাকার কাছাকাছি।
দু’বারের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই শিল্পীর অবসর ঘোষণায় সংগীতজগতে নিঃসন্দেহে এক বড় শূন্যতার সৃষ্টি হবে। তবে নতুন পথে এগিয়ে নিজের সৃষ্টিশীলতা দিয়ে শ্রোতাদের চমকে দিতে প্রস্তুত অরিজিৎ সিং- এমনটাই বিশ্বাস অনুরাগীদের।
কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলেন হঠাৎ, প্রাইভেট X হ্যান্ডলের কথোপকথন বিভাগে অরিজিৎকে প্রশ্ন করেন এক অনুরাগী। উত্তরে অরিজিৎ লেখেন, ‘এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যকারণ শুধুমাত্র একটি নয়। একাধিক কারণ রয়েছে। আমি অনেক দিন ধরেই এটা করার চেষ্টা করছিলাম। অবশেষে সাহসে কুলিয়ে উঠতে পরেছি। একটি কারণ হল, খুব তাড়াতাড়ি একঘেয়ে লাগতে শুরু করে আমার। যে কারণে এক-একটি গানের ব্যবস্থাপনাও পাল্টাতে থাকি আমি। সেই মতো স্টেজে পারফর্ম করি। তাই বলা যেতে পারে, একঘেয়েমি এসে যায় তাড়াতাড়ি’।
আর একটি পোস্টে অরিজিৎ লেখেন, ‘আর একটি কারণ হল, আমি চাই কোনও গায়ক আসুন এবং আমাকে সত্যিকারের অনুপ্রেরণা জোগান’। সত্যিই কি তাহলে একঘেয়ে বোধ থেকে এমন সিদ্ধান্ত নিলেন অরিজিৎ, তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে।

অরিজিতের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুরাগীরাও নানা তত্ত্ব সামনে এনেছেন। অরিজিতের পোস্ট ঘিরে একদিকে যখন আবেগের বিস্ফোরণ ঘটছে, সেই সময় বেশ কয়েক জন অরিজিতের শিল্পীসত্তাকে বাঁচিয়ে রাখার পক্ষে সওয়াল করেন। তাঁদের মতে, ইদানীং কালে বলিউড এবং অরিজিৎ কার্যতই পরস্পরের সমার্থক হয়ে উঠেছিলেন। অতি খাজা ছবিতেও অরিজিতের গান রাখার হিড়িক দেখা যাচ্ছিল। এতে অরিজিতের গানগুলি একই রকমের হয়ে যাচ্ছিল, তাঁর বহুমুখী প্রতিভা আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছিল, ‘ভার্সেট্যালিটি’ হারাচ্ছিলেন অরিজিৎ।

তবে বলিউডে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, অরিজিৎ আপাতত পরিচালনায় মন দিতে চাইছেন। একটি অ্যাডভেঞ্চার ছবি নিয়ে শীঘ্রই হাজির হচ্ছেন তিনি, যা গোটা দেশে মুক্তি পাবে। ছবিটির প্রযোজক মহাবীর জৈন। কেরিয়ারে নতুন অধ্য়ায় শুরু করতে যাচ্ছেন বলেই কি তাহলে প্লেব্যাক থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত? সেই নিয়েও জল্পনা চলছে।