সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
মহারাষ্ট্রের পুণেতে খুন হওয়া পুরুলিয়ার পরিযায়ী শ্রমিক সুখেন মাহাতোর মৃত্যুকে ঘিরে উত্তাল রাজ্য রাজনীতি। এই আবহেই শুক্রবার পুরুলিয়ায় যাচ্ছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি। দলীয় সূত্রে খবর, তিনি নিহত সুখেনের পরিবারের সঙ্গে দেখা করবেন এবং তাঁদের পাশে থাকার বার্তা দেবেন।
বুধবার রাতে সামনে আসে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা। অভিযোগ, পুণেতে কর্মরত অবস্থায় বাংলায় কথা বলার কারণে সুখেন মাহাতোকে কুপিয়ে খুন করা হয়েছে। সুখেনের বাড়ি পুরুলিয়ার জঙ্গলমহলের বরাবাজার এলাকার তুমড়াশোলের বাঁধডিতে। তিনি পুরুলিয়ার ৭৮ নম্বর বুথের ভোটার ছিলেন। জীবিকার তাগিদে মহারাষ্ট্রে গিয়ে একটি গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানায় কাজ করতেন। তাঁর দাদাও একই কারখানায় কর্মরত ছিলেন। পরিবারের আরও এক সদস্য ওয়েল্ডিং কারখানায় কাজ করেন।
তৃণমূলের অভিযোগ, ভাষাগত পরিচয়ের কারণেই এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ঘটনার পর থেকেই রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে রাজ্যে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে অবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, এই শোকার্ত সময়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার সুখেনের পরিবারের পাশে রয়েছে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সবরকম পদক্ষেপ করা হবে। মুখ্যমন্ত্রী এই ঘটনাকে “ঘৃণ্য অপরাধ” বলে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, এক যুবককে তাঁর ভাষা ও পরিচয়ের জন্য অত্যাচার করে হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। মঙ্গলবার সংসদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অভিষেক ব্যানার্জি ‘দুই ভারত’ তত্ত্ব তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের কিছু অংশে বাংলায় কথা বললেই মানুষকে বাংলাদেশি তকমা দেওয়া হচ্ছে, খাদ্যাভ্যাস নিয়েও কটাক্ষ করা হচ্ছে। তাঁর সেই বক্তব্যের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পুণের এই হত্যার ঘটনা সামনে আসায় বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
তৃণমূলের দাবি, বিজেপি শাসিত রাজ্যে বারবার বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর হামলার ঘটনা ঘটছে। জানুয়ারি মাসেও মহারাষ্ট্রে একই ধরনের একটি অভিযোগ উঠেছিল। মুম্বইয়ে কাজ করতে গিয়ে মুর্শিদাবাদের রিন্টু শেখ নামে এক যুবক খুন হন বলে অভিযোগ। তাঁর পরিবারের দাবি ছিল, বাংলায় কথা বলার কারণেই সহকর্মীরা তাঁকে মারধর করে হত্যা করেছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মসংস্থানের জন্য হাজার হাজার মানুষ পশ্চিমবঙ্গ থেকে অন্য রাজ্যে পাড়ি দেন। তাঁদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বারবার। সুখেন মাহাতোর মৃত্যুর ঘটনায় সেই উদ্বেগ আবার সামনে এল।
শুক্রবার অভিষেক ব্যানার্জির পুরুলিয়া সফর রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। একদিকে শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা, অন্যদিকে ভাষা ও পরিচয়কে ঘিরে রাজনীতির প্রশ্ন—দু’দিক থেকেই এই সফর তাৎপর্যপূর্ণ। এখন দেখার, তদন্তে কী উঠে আসে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে আপাতত পুরুলিয়ার এক সাধারণ পরিবারের শোকই রাজ্যের রাজনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।