সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আঁচ সরাসরি এসে পড়েছে বাংলায়। কেন্দ্রীয় সরকার এলপিজি গ্যাস বুকিং এর উপরে যে নিয়ন্ত্রণ জারি করেছে তার ফলে গোটা দেশের পাশাপাশি বাংলাতেও তৈরি হয়েছে আতঙ্কের পরিবেশ। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সংকট মেটানোর জন্য মাঠে নামলেন মমতা। আজ প্রধান তেল বিপণনকারী সংস্থাগুলির পাশাপাশি গ্যাসের ডিস্ট্রিবিউটর সংস্থাগুলির সঙ্গে বৈঠকে বসেন মুখ্যমন্ত্রী। আলিপুরের সৌজন্যে এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্য সচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি, কলকাতার পুলিশ কমিশনার সহ রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকরা।
এই বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী একদিকে যেমন কেন্দ্রীয় সরকারের অপরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণ জারির তীব্র সমালোচনা করেন, ঠিক তেমনভাবেই পরিকল্পিতভাবে বাংলায় উৎপাদিত গ্যাস যাতে আপাতত রাজ্যের বাইরে না পাঠিয়ে রাজ্যের সাধারণ মানুষের পাশাপাশি জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত হাসপাতাল, স্কুলের মিড ডে মিল, আইসিডিএস সেন্টারের মত জায়গাগুলিতে প্রথমে গ্যাস সরবরাহ করা হয় সেই ব্যাপারটি নিশ্চিত করার জন্য উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রশাসনিক কমিটি গঠন করে দেন। এই কমিটি তেল সংস্থা এবং গ্যাসের ডিস্ট্রিবিউটর সংস্থাগুলির সঙ্গে রাজ্য সরকারের সমন্বয়ে সাধন করে সাধারণ মানুষের মন থেকে আতঙ্ক কাটানোর পাশাপাশি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখে কালোবাজারি রোখার কাজ করবে।
বৈঠকের পরে মমতা জানান,
যুদ্ধ তো অনেকদিন হল লেগেছে। ওরা কথায় কথায় ধমকায়, এসআইআর করে ভোটার লিস্টে নাম কাটতে পারে আর রিজার্ভ ভাণ্ডার কতটা বলতে পারছে না? বিকল্প কোনও প্ল্যান নেই কেন?
অবিলম্বে কেন্দ্রকে প্রয়োজনে সংসদে বিবৃতি দিয়ে জানাতে হবে এই মুহূর্তে গ্যাসের ভাণ্ডার কত। সেই স্টক বুঝে সরকারকে প্রত্যেক রাজ্যের মধ্যে গ্যাস সমবন্টন করে দিতে হবে।
সবার আগে সাপ্লাই চেন ওপেন করতে হবে। কারণ এই পরিস্থিতিতে যদি কেউ কালোবাজারি করে তার জন্য দায়ী কেন্দ্র সরকার।
গ্যাসের মজুত ভাণ্ডার নেই কেন? গ্যাসের বিজ্ঞাপনে মোদীর ছবি দিয়ে প্রচার করছো, আমেরিকার মাধ্যমে রাশিয়ায় যাচ্ছো তেল কিনতে, তাহলে সাপ্লাই নেই কেন?
গ্যাস মানে ঘরকন্যা, এতে তো পরিবহণও চলে। কেন প্ল্যানিং না করে ঘোষণা করে দেওয়া হল, ২৫ দিনের আগে পাওয়া যাবে না। হঠাৎ করে ঘোষণা না করে মানুষকে বলা উচিত ছিল।
এটা ঠিক যে মানুষের মধ্যে একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। লোকে ভাবছে, আজ যদি রান্নার গ্যাস ফুরিয়ে যায়, তবে পরের সিলিন্ডার পেতে বোধহয় ২৫ দিন অপেক্ষা করতে হবে। এটা সত্যিই চিন্তার বিষয়।
তবে সমস্যাটা শুধু রান্নার গ্যাস নিয়েই, পেট্রোল বা ডিজেলের ক্ষেত্রে এখনও কোনও সঙ্কট নেই।
মজুত থাকা গ্যাসের পরিমাণ খতিয়ে দেখাই ছিল এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য। মানুষকে প্রতিদিন সঠিক তথ্য দিয়ে সচেতন করতে আমরা একটি এসওপি তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
আমরা অনুরোধ করেছি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আমাদের রাজ্যের হলদিয়া, কল্যাণী এবং দুর্গাপুরে যে গ্যাস শোধন করা হয়, তা যেন রাজ্যের বাইরে পাঠানো না হয়।
মিড-ডে মিলের জোগান যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, আমরা সেই অনুরোধ জানিয়েছি।
হাসপাতাল এবং হস্টেলগুলো যেন নিয়মিত গ্যাস পায় এবং সাধারণ বাড়ির গ্রাহকদের যাতে কোনও সমস্যায় পড়তে না হয়, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
রেস্তোরাঁ এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক কাজে যারা গ্যাস ব্যবহার করেন, তাঁদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
মিড-ডে মিল পরিষেবা স্বাভাবিক থাকবে। আইসিডিএস কেন্দ্রগুলোতে কোনও সমস্যা হবে না বলে তাঁরা আশ্বাস দিয়েছেন। স্বাস্থ্য পরিষেবাও এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
হাসপাতালের ক্যান্টিনগুলো নিয়েও কথা হয়েছে। সাধারণ বাড়ির গ্রাহকরা যাতে বিপদে না পড়েন, সেই অনুরোধও আমরা করেছি।
ওঁরা জানিয়েছেন, আতঙ্কে বুকিংয়ের চাহিদা ২ লক্ষ থেকে বেড়ে একলাফে ৬ লক্ষ হয়ে গেছে।
ওদের সার্ভার বিকল হয়ে গিয়েছিল। আমি ওদের সার্ভার ঠিক করতে বলেছি। ওদের কাছে সব তথ্য আছে।
যারা একটা মাত্র সিলিন্ডার ব্যবহার করেন এবং যাদের গ্যাস ফুরিয়ে গেছে বা ফুরিয়ে আসছে, তাদের যেন অবিলম্বে সিলিন্ডার দেওয়া হয়।
যারা বড় সিলিন্ডার নেন, তাদের ক্ষেত্রে ২৫ দিন আগে বুকিংয়ের যে নিয়ম আছে, সেখানেও বলেছি দুটো সিলিন্ডারের বদলে অন্তত একটা সিলিন্ডার যেন এখনই দিয়ে দেওয়া হয়।
সব এলাকায় যাতে গ্যাস সিলিন্ডার ঠিকমতো পৌঁছাতে পারে, তার জন্য আমরা গ্রিন চ্যানেল করে দেওয়ার কথা বলেছি।
সাধারণ মানুষ, ছোট রেস্তোরাঁ, আইসিডিএস কেন্দ্র এবং পর্যটন কেন্দ্রগুলো যেন কোনও সমস্যায় না পড়ে।
যতক্ষণ না বিদেশ থেকে গ্যাস আসা স্বাভাবিক হচ্ছে, ততক্ষণ রেশনিং করে জোগান দেওয়া প্রয়োজন।
খোলা বাজারে কেরোসিন সহজলভ্য করতে হবে এবং রেশনে ভরতুকিযুক্ত কেরোসিনের পরিমাণ বাড়িয়ে ৫০% করতে হবে।
সব অটো চালকদের ভাড়া বাড়ানোর দরকার নেই। যারা ডিজেল বা পেট্রোলে গাড়ি চালাচ্ছেন, তাদের কোনও সমস্যা নেই। কারণ ওই তেলের কোনও সঙ্কট নেই। সমস্যাটা শুধু সিএনজি গ্যাস নিয়ে।
আমরা বলেছি, জোগান স্বাভাবিক রাখতে যাতে অটো চালকদের সমস্যা মিটে যায়। অটো চালকরা বেশি দামে জ্বালানি কিনতে বাধ্য হচ্ছে বলেই ভাড়া বাড়াতে হয়েছে।
আমি আগামীকাল বিকেল ৪:৩০ মিনিটে জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপারদের নিয়ে একটি ভার্চুয়াল বৈঠক করব। প্রতিটি জেলার জন্য গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন এজেন্সিগুলো একজন করে নোডাল অফিসার নিয়োগ করবে।

এর ফলে প্রতিদিনের মোট অর্ডার, প্রকৃত প্রয়োজন এবং কোথায় কতটা মজুত করে রাখা হচ্ছে, তা জানা যাবে।
যদি কাউকে মজুত করে রাখতে দেখা যায়, তবে সরকার তা বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করবে।
আমরা আগামীকাল আমাদের এসওপি শেয়ার করব। শিল্প সচিব বন্দনা যাদব আমাদের নোডাল অফিসার হিসেবে কাজ করবেন।