শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনার আবহে এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্যের ইঙ্গিত মিলল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলা সংঘাতের মাঝেই নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করল ভারতের দুটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার।
‘পুষ্পক’ এবং ‘পরিমল’ নামে ওই দুই ভারতীয় জাহাজ বৃহস্পতিবার কোনও বাধা ছাড়াই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথ পেরিয়ে যায়। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যখন ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছে, তখন এই ঘটনাকে স্বস্তির খবর হিসেবেই দেখছে নয়াদিল্লি।
কূটনৈতিক মহলের মতে, দিল্লি ও তেহরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার ফলেই এই পথ খুলেছে।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র
হরমুজ প্রণালীকে বলা হয় বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম ‘লাইফলাইন’। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে যে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস যায়, তার বড় অংশই এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ভারতের ক্ষেত্রেও এই পথের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। দেশের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির একটি বড় অংশ পশ্চিম এশিয়া থেকে আসে, যার বড় অংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতীয় বন্দরে পৌঁছায়।
ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লেই ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
সংঘাতের আবহে কমেছে জাহাজ চলাচল
গত কয়েক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তীব্র আকার নিয়েছে। ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সতর্কবার্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একাধিক আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থা ঝুঁকি এড়াতে এই রুট এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনী ও ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস একাধিকবার সতর্ক করে জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে তারা এই জলপথে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে। এমনকি সতর্কতা উপেক্ষা করে কোনও জাহাজ প্রণালী পার হওয়ার চেষ্টা করলে তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয় বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
একের পর এক হামলায় আতঙ্ক
এই উত্তেজনার মধ্যেই সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি জাহাজ হামলার মুখে পড়েছে।
থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার ‘এমভি মায়ুরি নারি’-তে ক্ষেপণাস্ত্র সদৃশ হামলার ঘটনায় আগুন ধরে যায়। ওই ঘটনায় কয়েকজন নাবিক নিখোঁজ হন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়াও ‘ওয়ান ম্যাজেস্টি’ নামে একটি কার্গো জাহাজ এবং ‘স্টার গুইনেথ’ নামে একটি ট্যাঙ্কার হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে ইরাকের উপকূলের কাছে বিস্ফোরক বোঝাই নৌকা ব্যবহার করে ‘সেফসি বিষ্ণু’ এবং ‘জেফাইরোস’ নামে দুটি জ্বালানি ট্যাঙ্কারকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগও উঠেছে।
এই ধারাবাহিক ঘটনার পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু ভারতের
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝেই দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে ভারত।
বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সরাসরি ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে কথা বলেন বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গিয়েছে। আলোচনার মূল বিষয় ছিল হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা।
ভারতের তরফে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়—এই জলপথে বিঘ্ন ঘটলে শুধু আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার নয়, ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলিও বড় সমস্যায় পড়বে।
দিল্লি আরও জানায়, ভারতীয় জাহাজগুলি শুধুই বাণিজ্যিক পরিবহণে যুক্ত এবং কোনও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের অংশ নয়।
কূটনৈতিক মহলের মতে, এই বার্তাকে গুরুত্ব দিয়েই ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজগুলিকে আপাতত নিরাপদে যেতে দেওয়া হয়েছে।
ইরানের কৌশলগত বার্তা
পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারতীয় ট্যাঙ্কারকে নিরাপদে পার হতে দেওয়ার মধ্যে ইরানের একটি কৌশলগত বার্তাও রয়েছে।
তেহরান দেখাতে চাইছে, তাদের চাপ মূলত প্রতিপক্ষ শক্তিগুলির উপর—বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে। কিন্তু যেসব দেশ এখনও কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখেছে, তাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন অবস্থান নেওয়া হচ্ছে।
ভারতের সঙ্গে ইরানের ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং জ্বালানি সহযোগিতাও এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এখনও অপেক্ষায় একাধিক জাহাজ
তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। কূটনৈতিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, বর্তমানে হরমুজ প্রণালীর বাইরে অন্তত আটটি এলপিজি ট্যাঙ্কার অপেক্ষা করছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি পরিষ্কার না হওয়ায় তারা এখনও এগোতে পারেনি।
ভারত সরকার এই জাহাজগুলির নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
এদিকে মানবিক দিক থেকেও একটি বিষয় নজরে এসেছে। বর্তমানে প্রায় ২৫০ জন ইরানি নাবিক ভারতে রয়েছেন, যারা দেশে ফেরার অপেক্ষায়। তাঁদের জন্য অস্থায়ী সহায়তার ব্যবস্থা করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালী ঘিরে এই ঘটনাপ্রবাহ শুধু একটি সামুদ্রিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভারতের কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন।
ভারতের দুই ট্যাঙ্কারের নিরাপদে প্রণালী পেরোনো আপাতত স্বস্তি দিলেও, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা যদি আরও বাড়ে তবে আগামী দিনে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তার বড় প্রভাব পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
Iran has allowed two Indian-flagged liquefied petroleum gas (LPG) carriers to sail through the Strait of Hormuz, four sources with direct knowledge of the matter said: Reuters