‘সিংহম’ না বিতর্কের নায়ক? ভোটের আগে ডায়মন্ড হারবারে অজয় পাল শর্মাকে ঘিরে তুঙ্গে রাজনৈতিক ঝড়
সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার আগে ডায়মন্ড হারবারকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে এক নাম— অজয় পাল শর্মা। উত্তরপ্রদেশ ক্যাডারের এই আইপিএস অফিসারকে কেন্দ্র করে বিজেপি যেমন তাঁকে ‘দাবাং’ অফিসার বলে তুলে ধরছে, তেমনই বিরোধীরা তাঁকে নিশানা করে তুলেছে গুরুতর অভিযোগের পাহাড়। সমাজবাদী পার্টির সুপ্রিমো অখিলেশ যাদব থেকে তৃণমূল কংগ্রেস— সবার মুখে এক সুর, এই অফিসারকে ঘিরে প্রশ্ন বহু, বিতর্ক আরও বেশি।
ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্বে আসার পর থেকেই অজয় পাল শর্মাকে ঘিরে উত্তাপ বাড়তে থাকে। অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের গাইডলাইন উপেক্ষা করে তিনি সরাসরি এলাকায় সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছেন। ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির শেখের বাড়িতে গিয়ে তাঁর পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। যদিও এই অভিযোগের সরকারি স্বীকৃতি নেই, কিন্তু রাজনৈতিক মহলে তা নিয়ে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে।
‘বিজেপির এজেন্ট’ অভিযোগ অখিলেশের
উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব সরাসরি দাবি করেছেন, রামপুর-সম্ভলের ‘পরীক্ষিত’ অফিসারদের বাংলায় পর্যবেক্ষকের নাম করে পাঠানো হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। তাঁর বক্তব্য, এরা নিরপেক্ষ প্রশাসনিক আধিকারিক নন, বরং বিজেপির ‘এজেন্ডা বাস্তবায়নের’ অংশ।
Mamata Bhabanipur: ‘প্রথম দফাতেই সেঞ্চুরি পেরিয়েছে তৃণমূল’, পাঁচ বিধানসভায় পদযাত্রার শেষে দাবি মমতার
অখিলেশের দাবি, বাংলার মাটিতে এই ধরনের ‘অলিখিত আন্ডারগ্রাউন্ড সদস্যদের’ ভূমিকা একদিন না একদিন তদন্তের মুখে পড়বেই।
এই মন্তব্যের রাজনৈতিক অভিঘাত যথেষ্ট। কারণ বাংলার ভোটে বহিরাগত প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়, তবে এবার তা সরাসরি ব্যক্তি অজয় পাল শর্মাকে কেন্দ্র করে। (Ajay Pal Sharma Controversy Bengal Election
মহুয়ার পোস্ট করা ভিডিও ঘিরে নতুন বিতর্ক
তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় দুটি ভিডিও পোস্ট করে নতুন মাত্রা যোগ করেন এই বিতর্কে। তাঁর দাবি, ভিডিওতে নর্তকীদের সঙ্গে যাঁকে নাচতে দেখা যাচ্ছে, তিনি অজয় পাল শর্মা। পোস্টে তিনি ব্যঙ্গাত্মক সুরে প্রশ্ন তোলেন, এমন একজন অফিসার কি আদৌ নিরপেক্ষ নির্বাচন পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় মানানসই?
https://x.com/i/status/2048962130486198343
ভিডিয়োর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি, কিন্তু তা নিয়ে রাজনৈতিক আক্রমণ চরমে উঠেছে।
‘আমরা পুষ্পা রাজ, ঝুঁকেগা নেহি’— পাল্টা জাহাঙ্গীর
ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির শেখ সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। তাঁর কথায়, ভয় দেখিয়ে ডায়মন্ড হারবারকে দমিয়ে রাখা যাবে না। তিনি বলেন, “আমরা পুষ্পা রাজ, ঝুঁকেগা নেহি।” স্থানীয় মহিলাদের উদ্দেশে হুমকির অভিযোগ তুলে তিনি দাবি করেন, সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হলে তার জবাব রাজনৈতিক ভাষায় নয়, রাস্তায় মিলবে।
অজয় পালের অতীত ঘিরে একের পর এক অভিযোগ
বিতর্ক শুধু বর্তমান নয়, অতীতও টেনে আনা হচ্ছে। তৃণমূল ও সমাজবাদী পার্টির তরফে দাবি, উত্তরপ্রদেশে কর্মরত অবস্থায় অজয় পাল শর্মার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, পছন্দমতো পোস্টিংয়ে টাকা নেওয়া, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্ক সংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগ ওঠে। ২০২০ সালে তাঁকে রামপুর থেকে সরিয়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠানোর প্রসঙ্গও ফের সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে ভিজিল্যান্স তদন্ত হয়েছিল। এমনকি ব্যক্তিগত জীবনের কিছু বিতর্ক আদালত পর্যন্ত গড়ায় বলেও রাজনৈতিক শিবিরের দাবি। যদিও এসব অভিযোগের একাংশ পুরনো এবং সবই প্রমাণিত নয়, তবু ভোটের আবহে তা নতুন রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
তৃণমূলের সরাসরি হুঁশিয়ারি
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ, তৃণমূলের তরফে প্রকাশ্য সতর্কবার্তা। দলের অভিযোগ, রাতের অন্ধকারে তল্লাশির নামে বাড়িতে ঢোকা, মহিলাদের সঙ্গে অসভ্য আচরণ, ভয় দেখানো— এসব ঘটছে পর্যবেক্ষকের মদতেই।
এর পরই হুঁশিয়ারি, ভোট মিটে গেলেই দায় শেষ হবে না। তৃণমূল নেতাদের বক্তব্য, “আপনি যেখানেই যান, আইনের মুখোমুখি হতে হবে। প্রয়োজনে ঘেঁটি ধরে আদালতে আনা হবে।”
এই ভাষা নিছক রাজনৈতিক উত্তেজনা নয়, স্পষ্ট বার্তা— এই বিতর্ক ভোটের পরও থামবে না।
সিইও-র সাফাই
এই সমস্ত অভিযোগের জবাবে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল অবশ্য সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, অভিযোগ থাকতেই পারে, কিন্তু আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে। নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে ব্যক্তিগত অভিযোগের সরাসরি সম্পর্ক নেই।
এই মন্তব্যে কমিশন কার্যত দূরত্ব বজায় রাখার কৌশল নিয়েছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
প্রশ্ন উঠছে পর্যবেক্ষকের ভূমিকা নিয়েও
নির্বাচন কমিশনের অবজার্ভার হ্যান্ডবুক বলছে, পর্যবেক্ষকদের কাজ ভোট প্রক্রিয়ার ওপর নজর রাখা, প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া নয়। তাঁরা কমিশনের চোখ-কান, কিন্তু মাঠপর্যায়ে নির্দেশদাতা নন।
সেই জায়গা থেকেই প্রশ্ন উঠছে— যদি অভিযোগ অনুযায়ী সরাসরি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ হয়ে থাকে, তা হলে তা কি নিয়মবহির্ভূত নয়?
এই বিতর্ক শুধু একজন অফিসারকে ঘিরে নয়, নির্বাচনী নিরপেক্ষতার প্রশ্নও তুলছে।

ভোটের আগে কেন এত বড় ইস্যু?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডায়মন্ড হারবার প্রতীকী লড়াইয়ের কেন্দ্র। এখানে প্রশাসন, পর্যবেক্ষক, কেন্দ্রীয় বাহিনী— সবকিছুই রাজনৈতিক বার্তার অংশ হয়ে উঠেছে। অজয় পাল শর্মাকে ঘিরে বিতর্ক তাই নিছক ব্যক্তি আক্রমণ নয়, ভোটের narrative-এরও অংশ।

বিজেপি তাঁকে ‘কড়া অফিসার’ হিসেবে তুলে ধরছে। বিরোধীরা বলছে, তিনি রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ। সত্যি কোথায়, তা সময় বলবে।
তবে নিশ্চিত— বাংলার এই নির্বাচনে ব্যালটের পাশাপাশি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাও বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন একটাই নাম— অজয় পাল শর্মা।