সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
“একজন নাগরিকেরও অধিকার খর্ব করতে পারেন না। বিহার-অসমেও কি একই বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছিল? যদি সেখানে করে থাকেন, তাহলে এখানেও অনুমতি দেব। গাড়ির ক্ষেত্রে কেন বিধি নিষেধ প্রযোজ্য হবে না?” বাইকে কড়াকড়ি নিয়ে জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে কড়া ভাষায় ভর্ৎসনা করল কলকাতা হাইকোর্ট।
শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গেল বেঞ্চের পর এবার কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চেও হারতে হল কমিশনকে।
ভোটের মুখে সাধারণ মানুষের যাতায়াত এবং বাইক ব্যবহার নিয়ে নির্বাচন কমিশনের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে পরিবর্তন এনেছিল কলকাতা হাইকোর্ট (Kolkata High Court)। শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি কৃষ্ণা রাও স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বাইক মিছিল (Bike Rally) নিষিদ্ধ থাকলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের ওপর লাগামহীন নিষেধাজ্ঞা চাপানো যাবে না। আদালত জানিয়েছিল, বাইক ব্যবহার নিয়ে কমিশনের আগের নির্দেশিকাগুলি পুনর্বিবেচনা করে সংশোধন করতে হবে।
আদালতের নির্দেশে কী কী ছাড় দেওয়া হয়েছিল?
ভোট দিতে যাওয়ার জন্য পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাইকে বেরনো যাবে
অফিসযাত্রী, অ্যাপ-নির্ভর বাইক ট্যাক্সির চালক এবং গিগ-কর্মীরা বাইক নিয়ে যাতায়াত করতে পারবেন। তবে তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক
নির্বাচনের আগে বাইক র্যালি বা মিছিলের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকছে
কেন এই পরিবর্তন? আদালতের যুক্তি কী ছিল?
নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা এবং নাগরিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিচারপতি রাও বলেন, সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কমিশনের হাতে বিশেষ ক্ষমতা থাকলেও, তা আইনের কাঠামোর বাইরে গিয়ে ব্যবহার করা যায় না। বিচারপতি স্পষ্ট বলেন, “কোনও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর (SOP)-এই বাইক চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করার কথা উল্লেখ নেই। শুধুমাত্র সম্ভাব্য অপরাধের আশঙ্কায় সাধারণ নাগরিকদের চলাফেরার অধিকার খর্ব করা যুক্তিযুক্ত নয়।”
বিচারপতির মতে, নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা যেমন প্রশাসনের দায়িত্ব, তেমনই নাগরিকদের স্বাধীনতা রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই প্রকৃত প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয়।
বাইক-বিধি নিয়ে সিঙ্গল বেঞ্চের সেই নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করে মামলা করা হয় কমিশনের তরফে। সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চে নির্বাচন কমিশন। বাইক মিছিল (Bike Rally) বা দলবদ্ধভাবে বাইক চালানো নিয়ে আগের নির্দেশে কিছুটা সংশোধন আনল কলকাতা হাইকোর্ট (Kolkata High Court)। স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হল, নির্বাচনী বিধি মেনে বাইক র্যালি বা দলবদ্ধভাবে বাইক চালানো নিষিদ্ধ। তবে এককভাবে বাইক চালানোর ক্ষেত্রে কোনও বিধিনিষেধ থাকছে না।
সোমবার এই সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে বিচারপতি শম্পা সরকার ব্যক্তিগত চলাফেরার অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ পেশ করেন। তিনি জানান, “আমি যদি খোলা হাওয়ায় ঘুরতে বেরোতে চাই, তাহলে কোনও আইন আমাকে আটকাতে পারে না।” অর্থাৎ, সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বাইক ব্যবহারের অধিকারে আদালত কোনও হস্তক্ষেপ করতে চায় না।
এর পাশাপাশি আদালত পুলিশকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে। বিচারপতি জানিয়েছেন, ব্যক্তিগতভাবে বাইক চালানোর আড়ালে যদি কেউ কোনও বিশৃঙ্খলা, অশান্তি বা গোলমাল পাকানোর চেষ্টা করেন, তবে পুলিশ নিজের ক্ষমতাবলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

আদালতের পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, কোনও নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব করা যায় না। একই সঙ্গে ডিভিশন বেঞ্চ প্রশ্ন তোলে, বিহার ও আসামের ক্ষেত্রেও কি একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল? যদি সেখানে তা হয়ে থাকে, তবে এখানেও সেই বিধি প্রয়োগের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে বলে মন্তব্য আদালতের।
এছাড়াও, গাড়ির ক্ষেত্রে কেন এই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে না— সেই নিয়েও প্রশ্ন তোলে ডিভিশন বেঞ্চ।