সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
“ভারতের মতো যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে কোন রাজ্য সরকার যদি রাজ্য মন্ত্রিসভার ক্যাবিনেট বৈঠকে কোন নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে সেই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার দেশের বিচার ব্যবস্থার নেই। রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে সুপারনিউমেরারি পোস্ট তৈরি করা অসাংবিধানিক নয়।” এভাবেই আজ পশ্চিমবঙ্গ মন্ত্রিসভার ক্যাবিনেট বৈঠকে তৈরি করার সুপার নিউমেরারি পোস্ট তৈরির সিদ্ধান্ত বৈধ বলে জানানোর পাশাপাশি কলকাতা হাইকোর্ট এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল তা খারিজ করে দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। তবে, সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গে ২৫,৭৫৩ জন শিক্ষক ও কর্মচারীর নিয়োগের অন্যান্য দিকগুলি নিয়ে সিবিআই তদন্ত অব্যাহত থাকবে।
স্বাভাবিকভাবেই গত ৩ এপ্রিল বাংলার প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক শিক্ষিকা এবং অশিক্ষক কর্মচারীর চাকরি ছাঁটাইয়ছর পরে আজ সুপ্রিম কোর্টে বড় স্বস্তি পেল রাজ্য সরকার। সুপারনিউমেরারি পোস্ট বা অতিরিক্ত শূন্যপদ সংক্রান্ত মামলায় খারিজ হয়ে গেল কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের নির্দেশ। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্নার বেঞ্চে ছিল মামলার শুনানি। সুপারনিউমেরারি পোস্ট তৈরি করা অসাংবিধানিক নয় বলে উল্লেখ করেছেন প্রধান বিচারপতি।
এদিনের রায়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্নার নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, সুপার নিউমেরারি পদ যথেষ্ট আলোচনার মাধ্যমেই তৈরি করা হয়েছে। এই পদ তৈরির সময় ক্যাবিনেট নোটে উল্লেখ ছিল যে হাইকোর্টের নির্দেশের উপর এই সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা নির্ভর করবে। এমনকি, রাজ্যপালও এই সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করেছিলেন। এদিনের রায়ে সুপ্রিম কোর্ট আরও জানিয়েছে যে, মন্ত্রিসভার একটি নিজস্ব অধিকার রয়েছে এবং সেখানে আদালতের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই। এছাড়াও, মামলাকারীরা কেউই এই বিষয়ে সিবিআই তদন্তের আবেদন করেননি বলেও উল্লেখ করেছে শীর্ষ আদালত।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়ার দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ২০২১ সালে কলকাতা হাই কোর্টে বেশ কিছু মামলা দায়ের হয়েছিল। মামলা ওঠে হাই কোর্টের তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের এজলাসে। ২০২১ সালে ওই দুর্নীতি সংক্রান্ত একটি মামলায় প্রথম সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেন তিনি। পরে সিবিআই তদন্তের প্রেক্ষিতে কিছু ‘বেআইনি’ নিয়োগ বাতিলেরও নির্দেশ দেন তৎকালীন বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়। হাই কোর্টের ওই নির্দেশের পরে ২০২২ সালে ছ’হাজারেরও বেশি অতিরিক্ত শূন্যপদ তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষা দফতর। ওই বছরের ৫ মে ৬৮৬১টি অতিরিক্ত শূন্যপদ (সুপারনিউমেরারি পোস্ট) তৈরিতে অনুমোদন দেয় রাজ্য মন্ত্রিসভা।১৯ মে এই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিও জারি হয়।
তৎকালীন বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায় অতিরিক্ত শূন্যপদের বিজ্ঞপ্তি আটকে দেন। এ বিষয়ে সিবিআই তদন্তেরও নির্দেশ দেন তিনি। পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এসএসসি সংক্রান্ত মামলার শুনানির জন্য নতুন বেঞ্চ গঠিত হয়। ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি হাই কোর্টের বিচারপতি দেবাংশু বসাক এবং বিচারপতি মহম্মদ শব্বর রশিদির বিশেষ বেঞ্চে এসএসসি সংক্রান্ত যাবতীয় মামলার শুনানি শুরু হয়। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ এই তিন মাসে ১৭টি শুনানি হয় বিশেষ বেঞ্চে। অতিরিক্ত শূন্যপদের মামলাটিও ছিল ওই বিশেষ বেঞ্চেই। শুনানিপর্ব শেষে গত বছরের ২২ এপ্রিল রায় ঘোষণা করে হাই কোর্টের বিশেষ বেঞ্চ। রায়ে বলা হয়, অতিরিক্ত শূন্যপদ তৈরির সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না।
বিচারপতি বসাকের ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে ২০১৬ সালের এসএসসিতে গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়াকেই বাতিল করে দেওয়া হয়। বলা হয়, নিয়োগ প্রক্রিয়া সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪ এবং ১৬ লঙ্ঘন করেছে। তাই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে রায়ে বলা হয়, অতিরিক্ত শূন্যপদ তৈরিতে যাঁরা যুক্ত (মন্ত্রিসভা), তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে সিবিআই। প্রয়োজনে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা যাবে।
হাইকোর্টের রায় খারিজ সুপ্রিম কোর্টে
মন্ত্রিসভার সদস্যদের হেফাজতে নিয়ে তদন্তের যে নির্দেশ দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ, সেই নির্দেশ খারিজ করে দিল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ।
প্রধান বিচারপতি উল্লেখ করেছেন, সুপার সুপারনিউমেরারি পোস্ট তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে রাজ্যের মন্ত্রিসভা। অতিরিক্ত শূন্যপদ তৈরি করা অসাংবিধানিক নয়। সওয়াল জবাব শোনার পর অতিরিক্ত শূন্যপদ সৃষ্টির জন্য কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে নির্দেশ খারিজ করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না বললেন, “মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থা দিয়ে তদন্ত হলে ফেডেরাল স্ট্রাকচার (যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো) বিঘ্নিত হতে পারে।”
আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, সিবিআই তদন্তের নির্দেশ খারিজ করে দিয়েছে। সুপারনিউমেরারি পোস্ট নিয়ে কিছু বলেননি প্রধান বিচারপতি।” আইনজীবী ফিরদৌস শামিম জানিয়েছেন, অতিরিক্ত শূন্যপদ বৈধ কি না, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে হাইকোর্ট। আজ শুধুই মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, অতিরিক্ত শূন্যপদ তৈরিতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল। রাজ্যপালের অনুমোদনও নেওয়া হয়েছিল। সেই কারণে আদালতের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।
লড়াই চালানোর হুঁশিয়ারি বিকাশের
তবে, আদালতের এই রায়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁদের আইনি লড়াই থামবে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। এদিন তিনি বলেন, এই রায়ের ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের হয়তো একসঙ্গে জেলে যেতে হবে না, কিন্তু এটিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জয় বলা যায় না। রায় ঘোষণার পর আইনজীবী বিকাশবাবু বলেন, সুপ্রিম কোর্ট মনে করেছে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত একটি যৌথ সিদ্ধান্ত। তাই এক্ষেত্রে অপরাধমূলক কোনো প্রবণতা থাকতে পারে না। সেই কারণেই সিবিআই তদন্তের নির্দেশ বাতিল করা হয়েছে। তবে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অন্যান্য যে সমস্ত তদন্ত চলছে, সেগুলি একই ভাবে বহাল থাকবে। এই রায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের একসঙ্গে কারাবাস থেকে মুক্তি দেওয়ার জয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো বিজয় নয়।