সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
“মা-বোনেরা দাঙ্গা রুখবেন। আপনারা দয়া করে বিজেপির কথা শুনে বা আর কোনও ধর্মীয় সংগঠন, মৌলবাদীদের কথা শুনে ভাগাভাগি করবেন না। আপনারা যদি মানুষে মানুষে ভাগ করেন আমার হৃদয়টা আলাদা করে দিন। আমি দাঙ্গা চাই না। আমি দাঙ্গার বিরুদ্ধে। বাইরে থেকে লোক এনে দাঙ্গা করানো হয়। কারও কথায় দাঙ্গা করলে দিদি আপনার কাছে থাকবে না। দাঙ্গা রুখলে দিদি আপনার সঙ্গে থাকবে। আমরা শান্তি চাই।” এভাবেই মঙ্গলবার মুর্শিদাবাদের সুতির মঞ্চ থেকে জেলাবাসীকে শান্তি বজায় রাখতে আর্জি জানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দল এবং মৌলবাদীদের প্ররোচনায় পা নেওয়ার জন্য সতর্ক করলেন মমতা।
সুতিতে প্রশাসনিক বৈঠক করেন তিনি। সেখান থেকেই সুতি, ফরাক্কা ও ধুলিয়ানকে নিয়ে মুর্শিদাবাদে নয়া মহকুমা তৈরি করা হবে বলে জানালেন মমতা। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। মঙ্গলবার সুতির প্রশাসনিক সভায় জেলার জন্য একগুচ্ছ উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস কর্মসূচি ছিল মুখ্যমন্ত্রীর। মুর্শিদাবাদে ১৭৫টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরির জন্য ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। মুর্শিদাবাদে ১৬৭ প্রকল্পের শিলান্যাস ও উদ্বোধন করলেন মুখ্যমন্ত্রী। মোট ৭১৮ কোটি টাকার প্রকল্প ঘোষণা করেন তিনি।
দুপুরে সেখানে পৌঁছে আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য সরকারি পরিষেবা প্রদানের কাজ সেরে নেন। প্রথমেই মঞ্চে ডেকে নেন তেহট্টের শহিদ জওয়ান ঝন্টু আলি শেখের পরিবারকে। জওয়ানের স্ত্রী, দুই সন্তানকে মঞ্চে নিয়ে আসেন তৃণমূল নেতা সব্যসাচী দত্ত। ঝণ্টুর স্ত্রী শাহানাজের হাতে চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী। সবরকমভাবে পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। এরপর ওয়াকফ অশান্তির মাঝে পড়ে নিহত এজাজ আহমেদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্য তুলে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এদিন সুতির মঞ্চ থেকে মুর্শিদাবাদের ইতিহাস ধরেন মমতা। তিনি জানান, একসময় দেশের রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদ। মুর্শিদাবাদ শান্তির জায়গা ছিল। সেখানে দাঙ্গা কাম্য নয় কোনও মতেই। মমতা বলেন, “১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় সারা বাংলায় দাঙ্গা হলেও, মুর্শিদাবাদে হয়নি। দাঙ্গা করতে দেননি মুর্শিদাবাদের মানুষ। বাম আমলে কাটরা মসজিদে দেখেছিলাম। আমি এখানে এসেছিলাম। সেবার ৪০ জন মারা যান। আপনাদের অনুরোধ, আমি আপনাদের মাথার উপরে আছি, পায়ের নীচেও আছি। মানুষের পায়ের নীচে থাকা গর্বের বিষয়। বিশেষ করে যাঁরা মানুষের কাজ করেন।”
প্ররোচনা এড়ানোর বার্তা দিতে গিয়ে সরাসরি বিজেপি-কে নিশানা করেন মমতা। তিনি বলেন, “দয়া করে বিজেপি-র কথা শুনে, কোনও ধর্মীয় সংগঠন, মৌলবাদীদের কথা শুনে প্ররোচিত হবেন না। মানুষে মানুষে ভাগ করবেন না। মানুষে মানুষে ভাগ করার চেয়ে আমার গলাটা বাদ দিয়ে দিন। আমি তাতে সবচেয়ে খুশি হব। চোখের সামনে কোনও দাঙ্গা দেখতে চাই না আমি। মানুষ দাঙ্গা করেন না। পরিকল্পনা করে বাইরে থেকে দাঙ্গাকারীদের আনা হয়। কেউ কেউ প্ররোচনায় পা দিয়ে দেন। দয়া করে দেবেন না।” এরপরই তাঁর সংযোজন, “আমার ধর্ম একটাই। মা মাটি মানুষ আমার গোত্র। জগন্নাথ ধামেও আমায় জিজ্ঞেস করেছে আপনার গোত্র কী। আমি বলেছি, মা মাটি মানুষ।”
মমতা জানান, তিনি দুর্গাপুজো, কালীপুজোয় যেমন থাকেন, তেমনই ইদ, রমজান, বুদ্ধপূর্ণিমা, জৈন মন্দিরেও যান। তাঁর কথায়, “আমি যখন কালীঘাটে স্কাইওয়াক করি, তখন দাঙ্গাকারী রাজনৈতিক দলটা কিছু বলে না। আগে বলত, ‘মমতাজি দুর্গাপূজা, সরস্বতী পূজা করতে দেন না’। আমরা বলি, কোথা থেকে এসেছো তুমি জগৎ পিতা? বাংলায় সব উৎসব হয়।” ভিন্ রাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানান মমতা।
মুর্শিদাবাদ সহ বাংলার সর্বত্র সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার বার্তা দিয়ে মমতা বলেন, “কথা দিন কারও কথায় দাঙ্গা করবেন না। দাঙ্গা করলে সবাই যদি থাকেও, দিদি থাকবে না। আমি আলো চাই, অন্ধকার নয়। ধর্ম মানে মানবিকতা, ধর্ম মানে ভক্তি, ধর্ম মানে সম্প্রীতি, ধর্ম মানে সংস্কৃতি। আমি সব ধর্মকে ভালবাসি। তাই বলি, ধর্ম যার যার, উৎসব সকলের। রক্তদান শিবিরে যখন রক্ত দান করা হয়, সেই রক্ত কার, কোথায় যায় কেউ জানে না। হিন্দুর রক্ত মুসলিমের শরীরে, মুসলিমের রক্ত শিখের শরীরে চলে যায়। রক্ত জীবন বাঁচায়, রক্ত প্রাণ কাড়ে না। কথা দিন কারও কথায় দাঙ্গা করবেন না। যদি দাঙ্গা করসে, সবাই থাকলেও দিদি কিন্তু থাকবে না। আমি আলো চাই, অন্ধকার নয়। কী দাঙ্গা রুখবেন! কোনও ভাগাভাগি নয়। আমরা দাঙ্গা চাই না, শান্তি চাই। আমরা শান্তির পৃথিবীতে বাঁচতে চাই। ধর্ম মানে মানবিকতা, ধর্ম মানে ভক্তি, ধর্ম মানে সম্প্রীতি, ধর্ম মানে সংস্কৃতি। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, শিখ, সকলে ভাই ভাই।”
ওয়াকফ সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন থেকেই হিংসা ছড়িয়েছিল মুর্শিদাবাদে। সেই জেলাতে দাঁড়িয়েই মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “ওয়াকফ নিয়ে আমাদের এখানে কোনও প্রশ্ন নেই। এই নিয়ে আমি কিছু বলব না। ওয়াকফ নিয়ে বলার থাকলে দিল্লিতে যান। বাংলায় আমি আছি মাথায় রাখবেন।” পাশাপাশি বাংলার মানুষকে আশ্বস্ত করে বলেন “কেন্দ্র যদি কোনও আইন করে সেটা আমাদের হাতে থাকে না। আমরা বিরোধিতা করা সত্ত্বেও ওরা গায়ের জোরে করে। কিন্তু, বাংলায় আমি যতক্ষণ আপনাদের সঙ্গে আছি… না হিন্দু, না মুসলমান, না শিখ, না খ্রিস্টান, না কৃষক, না শ্রমিক, না ভাই না বোন, কারও গায়ে কোনও স্পর্শ করতে দেব না। আমরা সবাই আপনজন। আমরা কেউ কারও বিরুদ্ধে নই।”