শোভন গায়েন। কলকাতা সারাদিন।
পুলিশকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ বীরভূম জেলা তৃণমূলের কোর কমিটির সদস্য অনুব্রত মণ্ডলের বিরুদ্ধে। আর সেই অশ্রাব্য গালাগালির অডিও ক্লিপ রাজ্য বিজেপি সভাপতি সুকান্ত মজুমদার সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার পরেই তৃণমূলের পক্ষ থেকে চার ঘন্টার সময় বেঁধে দেওয়া হয় অনুব্রতকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার জন্য। দলের তরফে বেঁধে দেওয়ার সময় এর মধ্যে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে চিঠি দিয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করলেও বোলপুর থানার আইসির লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইতিমধ্যেই একাধিক গুরুতর ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে বীরভূমের প্রাক্তন জেলা সভাপতি অনুব্রত মন্ডলের বিরুদ্ধে। বীরভূমের ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ’ তৃণমূল নেতা ক্ষমা চাওয়ার চিঠিতে লিখেছেন, ”আমার ওই কথাগুলো বলা উচিত হয়নি। আমি দুঃখিত।”
শুক্রবার সকালে এক ভিডিয়ো পোস্ট করে এমনই দাবি করেছেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি সুকান্ত মজুমদার। এক অডিয়ো ক্লিপ পোস্ট করে তিনি দাবি করেছেন, বোলপুর থানার আইসিকে ফোনে হুমকি দিচ্ছেন বীরভূমের এক প্রভাবশালী নেতা। যার কণ্ঠস্বর মিলে যাচ্ছে অনুব্রত মণ্ডলের সঙ্গে। যদিও এই অডিওর সত্যতা যাচাই করেনি সকালের শিরোনাম। সোশ্যাল মিডিয়ায় সুকান্ত মজুমদার লিখেছেন, “এই ভাইরাল হওয়া ফোনালাপটি শুনলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে, রাজ্যের দুর্দমনীয় এবং দোর্দণ্ডপ্রতাপ মুখ্যমন্ত্রীর স্নেহের চাদরের তলায় কিভাবে ভয়াবহ সমাজবিরোধী ত্রাস’রা সযত্নে সুরক্ষিত রয়েছে! বীরভূমের ছাল ছাড়ানো বাঘ, যার কিনা মাঝে মধ্যেই ব্রেইনে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয় — তিনি একজন পুলিশ আধিকারিকের সঙ্গে ঠিক কি ভাষায় কথা বলছেন! আর এই কথপোকথন প্রকাশ্যে আসার পর প্রশাসনে কি প্রভাব পড়বে? বড় জোর ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই হয় ওই আধিকারিককে ক্লোজ করা হবে, নাহলে সুন্দরবনে বদলি! আমি চাই, পুলিশ মন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাজ্যের ডিজি সাহেব রাজীব কুমার দ্রুত এই বিষয়ে তদন্ত করে রাজ্যবাসীর কাছে জবাবদিহি করুন। তৃণমূলের নেতাদের কাছে পুলিশ সুরক্ষিত না হলে সাধারণ মানুষের কি অবস্থা!”
সুকান্তর দাবি, অডিয়ো ক্লিপে বোলপুরের আইসির সঙ্গে অশালীন ভাষায় কথা বলতে শোনা যাচ্ছে বীরভূমের এক প্রভাবশালী নেতাকে। এমনকী তাঁর পরিবার নিয়ে আক্রমণ করতে শোনা যাচ্ছে তাঁকে। আইসিকে থানা থেকে টেনে বার করে মারধর করার হুমকি দিচ্ছেন তিনি। সেই অডিয়ো ক্লিপে বলা হচ্ছে, ডেপুটেশন দিতে গিয়ে থানা থেকে বার করে আইসিকে পেটানো হবে। শুধু তাই নয়, বোলপুর থানার আইসির মা-স্ত্রীর উদ্দেশে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ শোনা যাচ্ছে। মিছিলের জমায়েতে পুলিশি রিপোর্ট নিয়ে আইসির বিরুদ্ধে তোপ দাগতেও শোনা গিয়েছে।
এক সাংবাদিক বৈঠকে অনুব্রত দাবি করেন, বোলপুরের আইসি লোককে ফোনে হুমকি দিয়ে টাকা চাইছেন। এমনকী বিভিন্ন ঘটনায় অভিযুক্তদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দিচ্ছেন। আমি ডিজিপি রাজীব কুমার থেকে শুরু করে এসপি পর্যন্ত সবার কাছে ফোন করে ওকে অপসারণের দাবি জানিয়েছি। কিন্তু কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি। এবার নিজেদের সরকারের পুলিশের বিরুদ্ধে নিজেই ডেপুটেশন দিতে পারি না। অনুব্রত মণ্ডলের আরও অভিযোগ, ”আইসি লিটন হালদারের কাছে এফআইআর বা কোনও কাজ করাতে গেলে তিনি শুধু টাকা চান। টাকা ছাড়া আইসি কিছু বোঝেন না।”
নবান্নের নির্দেশে শুক্রবার অনুব্রত মণ্ডলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। জেলা পুলিশ সুপার আমনদীপ জানিয়েছেন, আইসি লিটন হালদারের অভিযোগের ভিত্তিতে বিএনএস আইনের চারটি ধারায় অনুব্রত মণ্ডলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ওই ধারা গুলি হল ২২৪, ১৩২, ৩৫১ ও ৭৫। এই প্রসঙ্গে জেলার পুলিশ সুপার অমনদীপ জানিয়েছেন, অফিসারকে কদর্য ভাষায় গালিগালাজ করার অভিযোগে অনুব্রতর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থা, সরকারি কর্মীকে হুমকির মামলা রুজু করা হয়েছে। কেষ্ট বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলির বেশির জামিন-অযোগ্য। পাশাপাশি, তাঁর বিরুদ্ধে যতটা কড়া আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব, ততটাই নেবে বলেও জানিয়েছেন সুপার।
অন্যদিকে, বোলপুর থানার আইসি লিটন হালদারকে নোংরা ভাষায় গালমন্দ করার জন্য অনুব্রত মণ্ডলকে ভর্ৎসনা করল তৃণমূল। শুক্রবার দুপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশের পর তৃণমূলের তরফে জানিয়ে দেওয়া হয়, এই সব কথা কোনওভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তৃণমূলের তরফে এক বিবৃতিতে বলা হয়, “অনুব্রত মণ্ডল একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন, তার সঙ্গে আমাদের দল সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করছে এবং এই মন্তব্যকেও সমর্থন করছে না। আমরা তাঁর অপমানজনক ও অগ্রহণযোগ্য অশ্রাব্য ভাষার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। দল তাঁকে নির্দেশ দিচ্ছে, তিনি যেন আগামী ৪ ঘণ্টার মধ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চান, অন্যথায় তাঁর বিরুদ্ধে শোকজ নোটিশ জারি করা হবে।”
ক্ষমা প্রার্থনা অনুব্রতর
এদিন দুপুর আড়াইটা নাগাদ নির্দেশিকা জারি করে অনুব্রত মণ্ডলকে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ দেয় তৃণমূল। দল বলেছে করতে তো হবে। আনুগত্য মেনে ক্ষমা চাইলেন অনুব্রত। দলের নির্দেশের দু’ঘণ্টার মধ্য়ে লিখিত ভাবে ক্ষমা চিঠি পাঠালেন কেষ্ট। তিনি যে ভুল করেছেন, তা স্বীকার করে নিয়েছেন তিনি। এদিন ক্ষমা প্রার্থনার চিঠিতে তিনি লেখেন, “সত্যিই আমি দুঃখিত। দিদির পুলিশের কাছে ১০০ বার ক্ষমা চাইতে রাজি আছি। আসলে আমি নানা রকম ওষুধ খাই। দিদির পুলিশের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করলে আমার মাথা গরম হয়ে যায়।” তবে ক্ষমা চাইলেও সব শেষে তাঁর বিরুদ্ধে বীরভূমে চলা চক্রান্তের কথাও তুলে ধরেন কেষ্ট। তিনি বলেন, “তিনটে মহকুমা বোলপুর, সিউড়ি, রামপুরহাটে বিশাল মানুষের মহামিছিল হয়। তা দেখে কারা ভয় পেল? বিজেপি কীভাবে আইসি-কে গালিগালাজ করার ফুটেজ পেল? কে দিল? কোনও চক্রান্ত নেই তো?”