সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
ঘড়িতে তখন ১ টা বেজে ৩৮ মিনিট। বৃহস্পতিবার দুপুরে আহমেদাবাদের সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে টেক অফের কিছুক্ষণের মধ্যেই ভেঙে পড়ে এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ড্রিমলাইনার ৭৮৭ বিমান। ২৪২ জন যাত্রী নিয়ে লন্ডনে যাচ্ছিল বিমানটি। সরকারিভাবে ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছিল, বিমানের কোনও যাত্রীই আর বেঁচে নেই। ওই বিমানে ছিলেন গুজরাতের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রূপাণি। তাঁরও মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু পরে অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে যান একজন। ভয়াবহ এই বিমান দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরেই যাবতীয় কর্মসূচি ফেলে গুজরাতে ছুটে গেলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শোকপ্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিশ্বের প্রায় সমস্ত দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা।
এয়ার ইন্ডিয়ার তরফে জানানো হয়েছে, বিমানটি বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা ৩৮ মিনিটে আহমেদাবাদ বিমানবন্দরের ২৩ নম্বর রানওয়ে থেকে উড়েছিল। গন্তব্য ছিল লন্ডনের অদূরে গ্যাটউইক বিমানবন্দর। বিমানে সওয়ার ছিলেন ২৪২ জন। কত জনের মৃত্যু হয়েছে, এখনও পর্যন্ত সরকারি ভাবে তা প্রকাশ করেনি প্রশাসন। বিমানটি ভেঙে পড়েছে বিমানবন্দরের কাছে লোকালয়ে। বিমানের একটি বড় অংশ বিমানবন্দর সংলগ্ন বিজে হাসপাতালে জুনিয়র ডাক্তারদের একটি হোস্টেলে। বিমানটি এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) কে একটি ‘মে-ডে কল’ দিয়েছিল, যা শেষ মুহূর্তে প্রাণের জন্য আকুল আবেদন ছিল। কিন্তু বিধির বিধান ছিল ভিন্ন। বিমানবন্দরের বাইরে একটি হাসপাতালের হস্টেলের উপরে বিমানটি প্রথমে আঘাত হানে। জানা গেছে, এটি প্রথমে বিজে মেডিকেল কলেজের মেসে ধাক্কা মারে এবং এরপর অতুল্যম হস্টেলে, যেখানে সিনিয়র রেসিডেন্ট ডাক্তাররা থাকতেন।
শোক প্রকাশ প্রধানমন্ত্রীর
ঘটনায় শোকপ্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ত লেখেন, “আহমেদাবাদের দুর্ঘটনায় আমি হতবাক এবং দুঃখিত। এই যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ সম্ভব নয়।”
নিহত গুজরাটের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রূপানি
যে বিমানটি ভেঙে পড়ে, সেখানেই ছিলেন গুজরাটের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রূপানি। লন্ডনে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন রূপানি। কিন্তু মেয়ের কাছে পৌঁছনোর আগেই সব শেষ। বিজেপি সাংসদ সম্বিৎ পাত্র এক্স হ্যান্ডলে এই সংবাদ জানিয়ে শোকপ্রকাশ করে লিখেছেন, বিজয় রূপানির প্রয়াণ কেবল গুজরাটেরই নয়, ভারতীয় রাজনীতির জন্যই অপূরণীয় ক্ষতি।
বিমানে ছিলেন ৬১ বিদেশি যাত্রী
এয়ার ইন্ডিয়ার AI171 বিমানটি এদিন লন্ডন যাওয়ার পথে দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়। বিমানে ২৪২ জন যাত্রী সওয়ার ছিলেন। এটি দুই ইঞ্জিন বিশিষ্ট বোয়িং ৭৮৭-৮ বিমান। বিমানযাত্রীদের মধ্যে ১৬৯ জন ভারতীয়, ৫৩ জন ব্রিটিশ, ১ কানাডার এবং ৭ পর্তুগিজ ছিলেন। এই প্রথম কোনও বোয়িং ৭৮৭ বিমান দুর্ঘটনাগ্রস্ত হল। ডিজিসিএ-র তরফ থেকে জানানো হয়েছে ২৪২ জনের মধ্যে ছিলেন ২ জন পাইলট ও ১০ জন কেবিন ক্রু।
অলৌকিক বাঁচার গল্প
আহমেদাবাদে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার মধ্যে এক অলৌকিক ঘটনা সামনে এসেছে। এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট এআই১৭১-এ থাকা যাত্রীদের মধ্যে একজন, রমেশ বিশ্বাসকুমার বুচারভাড়া, জীবিত বেরিয়ে এসেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। ৩৮ বছর বয়সী রমেশ, যিনি ১১এ নম্বর সিটে বসে ছিলেন, দুর্ঘটনার সময় কোনোভাবে বিমানের ভেতর থেকে লাফ দিয়ে পড়েন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। আহমেদাবাদের পুলিশ কমিশনার জি.এস. মালিক বলেন, “আমরা একজন বেঁচে থাকা যাত্রীকে হাসপাতালে পেয়েছি, যিনি ১১এ সিটে ছিলেন। তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন। এখনও মৃত্যুর নির্দিষ্ট সংখ্যা বলা যাচ্ছে না, কারণ বিমানটি আবাসিক এলাকায় ভেঙে পড়েছে এবং উদ্ধারকাজ চলছে।”

নিহতদের পরিবার পিছু ১ কোটি টাকা
নিহতদের পরিবার পিছু ১ কোটি টাকা আর্থির সাহায্যের ঘোষণা টাটার। যে হস্টেলে বিমান ভেঙে পড়েছিল সেখানকার নিহতদের পাশে দাঁড়ানোরও আশ্বাস।
ঝলসানো দেহ চিনতে পরিজনদের ডিএনএ পরীক্ষা
আহমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনায় মৃতদের শনাক্ত করতে পরিবারের কাছে ডিএনএ নমুনা চাইল গুজরাত প্রশাসন। চারিদিকে ঝলসানো দেহের স্তুপ! দেহ নয়, পড়ে রয়েছে দেহাংশ। কিন্তু তাও এতই ক্ষতবিক্ষত যে, চেনাই যাচ্ছে না। ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া মৃতদের শনাক্ত করা সম্ভব নয়। বিমান দুর্ঘটনায় যাঁদের মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের বাবা-মা, ভাই বোনদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে আহমেদাবাদের বিজে হাসপাতালে। এরপর সেই রক্তের নমুনা থেকে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে গান্ধীনগরের ফরেন্সিক ল্যাবে।
২ ইঞ্জিনেই পাখির ধাক্কা বলে অনুমান ডিজিসিএ-র
আহমেদাবাদের বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে অসামরিক বিমান নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিজিসিএ। ডিজিসিএ উল্লেখ করেছে এয়ার ইন্ডিয়ার ওই অভিশপ্ত বিমানের ককপিটে ছিলেন ক্যাপ্টেন সুমিত সাভারওয়াল, যাঁর ৮২০০ ঘণ্টা ওড়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এছাড়া কো পাইলট ক্লাইভ কুন্দ্রারও ১১০০ ঘণ্টা বিমান ওড়ানোর অভিজ্ঞতা আছে বলে জানা গিয়েছে। অর্থাৎ দুজনেই ছিলেন অভিজ্ঞ পাইলট। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে পাখির ধাক্কার কথা উল্লেখ করেছে ডিজিসিএ। বিমানের দুটি ইঞ্জিনেই পাখির ধাক্কা লেগেছিল বলে অনুমান নিয়ন্ত্রক সংস্থার। সঙ্গে সঙ্গে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে, সবটাই অনুমান করা হচ্ছে। ব্ল্যাক বক্স সামনে এলে তবেই আসল কারণ স্পষ্ট হবে।
পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি বিরোধীদের
কিন্তু কেন দুর্ঘটনা? ওড়ার ঠিক পাঁচ মিনিটের পর কীভাবে ভেঙে পড়ল বিমান? এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার এয়ারবাস উড়ানের জন্য যথেষ্ট নিরাপদ। ২০১১ সাল থেকে যাত্রা শুরুর পর এ যাবৎ এই বিমানটি কোথাও দুর্ঘটনার কবলে পড়েনি। তাহলে এই দুর্ঘটনা ঘটল কীভাবে? নানা জনের নানা মত। কেউ কেউ বলছেন, বিমানের ইঞ্জিনে যান্ত্রিক গোলযোগ ছিল। কোনও কোনও বিশেষজ্ঞের ধারণা, ওড়ার পর যে কোনও কারণেই হোক, যে উচ্চতায় বিমানটি ওড়ার কথা ছিল, সেই উচ্চতায় সেটি ওঠেনি। কারও কারও ধারণা, বিমানটি পাখির সঙ্গে ধাক্কা খেতে পারে। আবার কোনও কোনও মহল থেকে এই দুর্ঘটনার নেপথ্যে অন্তর্ঘাতের তত্ত্বও ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দুর্ঘটনার কারণটা কী? সেটা স্পষ্ট হবে ব্ল্যাকবক্স উদ্ধার হওয়ার পরও। তবে আপাতত বিরোধী শিবির পুরো ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চাইছে।
বিরোধীদের মধ্যে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই দুর্ঘটনার তদন্ত দাবি করে সোশাল মিডিয়ায় লেখেন, “আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়া বিমানের মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আমি গভীরভাবে শোকাহত। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় যারা প্রিয়জনকে হারিয়েছে তাদের পরিবারের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা। এই ট্র্যাজেডির কারণ জানতে সরকারের পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং স্বচ্ছ তদন্ত করা উচিত।” একা অভিষেক নন, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেও পুরো ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চেয়ে লিখেছেন, “সুপ্রিম কোর্টের কোনও বিচারপতি বা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির তত্ত্বাবধানে তদন্ত হওয়া উচিত। কেন দুর্ঘটনা? কারা দোষী? সবটা সামনে আসা দরকার।”

শুরু আন্তর্জাতিক তদন্ত
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার তদন্ত করবে এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, “যখন কোনও আন্তর্জাতিক ঘটনা ঘটে, তখন সেই সরকার তদন্তের নেতৃত্ব দেয়। সহায়তা চাওয়া হলে, এনটিএসবি হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারী প্রতিনিধি এবং এফএএ প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করে।” তারা এনটিএসবি-এর সঙ্গে সমন্বয় করে অবিলম্বে একটি দল গঠন করতে প্রস্তুত, যাতে এই দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয় করা যায় এবং ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি এড়ানো সম্ভব হয়।