সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
”ওরা জানে ধর্মের মানে কী? আর বলে দিচ্ছে বাংলা নামে কোনও ভাষা নেই!” এভাবেই মঙ্গলবার আরো একবার রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কামারপুকুর থেকে বিজেপির বিরুদ্ধে বাংলা বিরোধী বলে অভিযোগ করে তীব্র আক্রমণ শানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দিল্লি পুলিশ বাংলা ভাষাকে অপমান করে তাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলে অপমান করেছে বলে সরব হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তার পাল্টা দিয়ে বিজেপি নেতা অমিত মালব্য মন্তব্য করেছেন – বাংলা বলে আদতে কোনও ভাষাই নেই! সেই কারণে রাজ্য রাজনীতি তোলপাড়। এদিন কামারপুকুরের অনুষ্ঠান থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই নিয়ে বলেন, “জাতীয় সংগীত লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বন্দে মাতরম লিখেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। হিন্দু ধর্মের পথপ্রদর্শক রামকৃষ্ণদেব, স্বামী বিবেকানন্দ, সারদা মা-সবাই বাঙালি। সমাজ সংস্কারক বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো মহান বাঙালিরা দেশকে পথ দেখিয়েছেন।” তিনি মনে করিয়ে দেন, এঁরা সবাই বাংলা ভাষায় কথা বলতেন এবং বাঙালির এই ঐতিহ্য নিয়ে কোনো রকম অসম্মান মেনে নেওয়া হবে না।
মুখ্যমন্ত্রী বিজেপির বিরুদ্ধে ধর্মের ভিত্তিতে বিভেদ সৃষ্টির অভিযোগ আগেও তুলেছেন। এদিনও একই সুরে তিনি বলেন, “ধর্মকে জানতে আমাদের অন্য কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। ঠাকুর রামকৃষ্ণ, সারদা মায়ের সঙ্গেই তা জানা যায়। তাঁরা আমাদের ধর্মের পথ দেখিয়েছেন। রামকৃষ্ণদেব সবাইকে একসঙ্গে থাকার শিক্ষা দিয়েছেন, তাই আমাদের মধ্যে কোনো ভাগাভাগি নেই।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের ভাষা নিয়ে কেউ খেলার চেষ্টা করবেন না, অসম্মান করার চেষ্টা করবেন না।”
স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো ধর্ম মহাসভায় হিন্দু ধর্মের ধ্বজা ওড়ানোর প্রসঙ্গ টেনে মমতা বলেন, “বিবেকানন্দকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। কখনও রাস্তায়, কখনও ট্রেনের কামরায় রাত কাটিয়েছেন। এঁরা সবাই কিন্তু বাংলা ভাষায় কথা বলতেন, মনে রাখবেন।” এর মাধ্যমে তিনি বাঙালি মনীষীদের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গর্ববোধ করার বার্তা দেন।
হুগলির কামারপুকুরে গিয়ে বিজেপিকে নাম না করে তীব্র কটাক্ষ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার জয়রামবাটি ও কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মঠের নতুন অতিথিনিবাস এবং পার্কিংয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে তিনি বাঙালির গৌরবময় ইতিহাস এবং সর্বধর্ম সমন্বয়ের বার্তা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠান থেকে মুখ্যমন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন। তিনি জয়রামবাটি কামারপুকুর ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠনের কথা জানান এবং এর জন্য ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেন। এই বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে জয়রামবাটি কামারপুকুর রামকৃষ্ণ মঠের লোকত্তরানন্দ মহারাজকে নিযুক্ত করা হয়েছে।
নিজ হাতে খিচুড়ি পরিবেশন মুখ্যমন্ত্রীর
আরামবাগে ভয়াবহ প্লাবন পরিস্থিতি পরিদর্শনে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুর্গতদের পাশে দাঁড়ালেন। মঙ্গলবার তিনি কামারপুকুরে একটি ত্রাণ শিবিরে যান এবং নিজে হাতে ত্রাণসামগ্রী ও খাবার পরিবেশন করেন। ত্রাণ শিবিরে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী প্লাবিত এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের দুর্ভোগের কথা শোনেন। তিনি তাদের আশ্বস্ত করেন যে, সরকার তাদের পাশে আছে এবং সবরকম সহায়তা দেবে। এরপর তিনি নিজেই দুর্গতদের পাতে খিচুড়ি পরিবেশন করেন। মুখ্যমন্ত্রীর এমন মানবিক আচরণে অসহায় মানুষ আপ্লুত হয়ে পড়েন।
ঘাটালের বন্যায় ডিভিসি দায়ী
হুগলির বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শনের পর এবার ঘাটালের বন্যা দুর্গতদের পাশে দাঁড়ালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গে ছিলেন ঘাটালের সাংসদ দেব অধিকারী। মঙ্গলবার ঘাটালের বন্যা পরিস্থিতির জন্য সরাসরি দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (ডিভিসি)-কে দায়ী করেছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ডিভিসি-র বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার কড়া পদক্ষেপ নেবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “ডিভিসি যখন তখন জল ছেড়ে দেয়, আর তার ফলে ঘাটাল সহ বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তলায় চলে যায়।” তিনি আরও বলেন, এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য রাজ্য সরকার কিছু নতুন বাঁধ নির্মাণ করবে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা বেশ কয়েকটি নতুন ড্যাম তৈরি করব, যাতে ডিভিসি জল ছাড়লেও সেই জল আমাদের ড্যাম দিয়ে ডিভিসি-র দিকেই ফিরিয়ে দেওয়া যায়।”
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “বাংলা একটি নদীমাতৃক দেশ। নেপালে বৃষ্টি হলে উত্তরবঙ্গ প্লাবিত হয়, আর ডিভিসি যখন মাইথন ও পাঞ্চেত থেকে জল ছাড়ে, তখন দক্ষিণবঙ্গ ভেসে যায়।” তিনি ডিভিসি-র বিরুদ্ধে ‘অত্যাচার’ করার অভিযোগ তোলেন এবং বলেন, “এই অত্যাচার আর সহ্য করব না। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরেই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, বিহার ও অসমের মতো রাজ্যগুলো বন্যার জন্য কেন্দ্রের থেকে অর্থসাহায্য পেলেও, বাংলার ক্ষেত্রে তা হয় না। কেন্দ্রীয় সরকারের এমন বিমাতৃসুলভ আচরণের তীব্র নিন্দা করে তিনি বলেন, “ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের জন্য কেন্দ্র কিছুই করেনি। এই প্ল্যানের জন্য রাজ্য সরকার দেড় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে।”