সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বাংলার প্রথম এসি লোকাল ট্রেনের যাত্রা শুরু হলো। রবিবার কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার ও জাহাজ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর সবুজ পতাকা নেড়ে শিয়ালদহ-রানাঘাট রুটে এই নতুন পরিষেবাটির সূচনা করেন। এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রচুর মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যায় এবং গোটা ট্রেনটিকে ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছিল।
পূর্ব ভারতের মধ্যে প্রথম এই এসি লোকাল ট্রেনটিতে ১১২৬টি আসন রয়েছে। ট্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে মহিলাদের সুরক্ষার জন্য একাধিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ট্রেন থামানো বা আরপিএফের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। মহিলাদের জন্য ইঞ্জিনের সামনে ও পিছনে দুটি বগি সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
শিয়ালদহ থেকে উদ্বোধন হয়ে গেল পূর্ব ভারতের প্রথম এসি লোকাল। চালকের আসনে মহিলা লোক পাইলট মাম্পা ধারা। রাজ্যের প্রথম শীততাপ নিয়ন্ত্রিত লোকাল ট্রেন পেলে পশ্চিমবঙ্গ। চেন্নাইয়ের ইন্টিগ্রাল কোচ ফ্যাক্টরি দ্বারা তৈরি করা হয়েছে এই নতুন এসি ইএমইউ ট্রেন। এটি বাংলার রেল নেটওয়ার্কের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে চলেছে। ট্রেনটি পূর্ব রেলওয়ের শিয়ালদহ ডিভিশনে বরাদ্দ করা হয়েছে। এদিন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিলেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর, সুকান্ত মজুমদার। ছিলেন বিজেপি সাংসদ তথা রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, জগন্নাথ সরকারের মতো ব্যক্তিত্বরা।
পশ্চিমবঙ্গের প্রথম এসি লোকাল ট্রেনটি শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট পর্যন্ত চলবে। মাত্র ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটে পুরো দূরত্ব অতিক্রম করবে। ট্রেনটি সর্বোচ্চ ১১০ কিমি প্রতি ঘণ্টা গতিতে চলবে। পূর্ব রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটি একটি দ্রুতগতির পরিষেবা হবে। গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলিতে কম স্টপেজ দিয়ে এটি একটি প্রিমিয়াম শহরতলির পরিবহণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হবে।
পূর্ব ভারতের প্রথম এসি লোকালের চালকের আসনে ছিলেন মহিলা লোক পাইলট মাম্পা ধারা। ২০২৩ সালে সোলাপুর স্টেশন এবং ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ টার্মিনাসের মধ্যে পথচলা শুরু হয়েছিল বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের। চালকের আসনে ছিলেন এশিয়ার প্রথম মহিলা লোকো পাইলট সুরেখা যাদব। তিনিই ছিলেন কোনও বন্দে ভারতের প্রথম মহিলা চালক। বাংলার প্রথম এসি লোকালের প্রথম মহিলা হিসাবে চালকের আসনে বসে উচ্ছ্বসিত মাম্পাও। তাঁকে এই জায়গা দেওয়ার জন্য রেল প্রশাসনের ভূয়সী প্রশংসা করলেন।
মাম্পা বলেন, “পূর্ব ভারতের প্রথম এসি লোকাল প্রথম লোকো পাইলট হিসাবে চালানো একশো শতাংশই গর্বের। আমাকে যে চয়েস করা হয়েছে এর জন্য রেল প্রশাসনকে ধন্যবাদ দিচ্ছি। আমি আমার ১০০ শতাংশ দিয়ে কাজটা করার চেষ্টা করব।”
শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট এসি লোকাল ট্রেনে ১২টি সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেইনলেস স্টিল বডির কোচ রয়েছে, যা নিরাপদ ও আরামদায়ক যাত্রার নিশ্চয়তা দেবে। এতে ১,১২৬ জন যাত্রীর বসার ব্যবস্থা আছে। এই ট্রেনটি তার যাত্রাপথে চাকদহ, কল্যাণী, কাঁঁচরাপাড়া, নৈহাটি, ব্যারাকপুর, খড়দহ, সোদপুর, দমদম এবং বিধাননগর স্টেশনে থামবে।
শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট এসি লোকাল ট্রেনের ভাড়া বেশ সাশ্রয়ী। পুরো যাত্রাপথের জন্য ভাড়া ১২০ টাকা এবং সর্বনিম্ন ভাড়া ৩৫ টাকা। এছাড়া, নিত্যযাত্রীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের টিকিটের ব্যবস্থা আছে, যেমন: দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক এবং মাসিক টিকিট।
শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট এসি ইএমইউ ট্রেনের প্রথম বাণিজ্যিক পরিষেবা চালু হবে সোমবার থেকে।
সাধারণ লোকাল ট্রেনের তুলনায়
শিয়ালদহ-রানাঘাট এসি ইএমইউ ট্রেনের রয়েছে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। যেমন, ট্রেনটিতে রয়েছে প্রশস্ত ইন্টেরিয়র এবং এক কোচ থেকে অন্য কোচে যাওয়ার জন্য ভেস্টিবিউল সংযোগ।
পুরো ট্রেনটি সিসিটিভি নজরদারির আওতায় থাকবে এবং জরুরি অবস্থার ক্ষেত্রে চালক বা গার্ডের সাথে যোগাযোগের জন্য যাত্রীদের একটি টক-ব্যাক সুইচ দেওয়া হয়েছে।
জিপিএস-সক্ষম এলইডি ডিসপ্লে সিস্টেম যাত্রীদের রিয়েল-টাইম তথ্য এবং ঘোষণা প্রদান করবে।
সমস্ত কোচে ডাবল-সিলড কাঁচের জানালা লাগানো আছে, যা যাত্রীদের আরামদায়ক ভাবে বাইরের দৃশ্য দেখতে সাহায্য করবে।
এই এসি ট্রেনের সমস্ত দরজা বৈদ্যুতিকভাবে চালিত স্লাইডিং দরজা যা শুধুমাত্র স্টেশনে পৌঁছানোর পরেই খুলবে, যার ফলে এটি একটি অত্যন্ত নিরাপদ এবং কার্যকর পরিষেবা হবে।

এই এসি ইএমইউ ট্রেনটি শিয়ালদহ এবং রানাঘাটের মধ্যে সকাল ও সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে চলাচল করবে।
রেল সূত্রে জানা গেছে, শিয়ালদহ-রানাঘাট রুটের পর শিয়ালদহ-বনগাঁ রুটেও আরও একটি এসি লোকাল চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শিয়ালদহের ডিপিও একলব্য চক্রবর্তী জানিয়েছেন, আরও একটি রেক এসে পৌঁছেছে, তবে কোন রুটে সেটি চলবে তা এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। দৈনিক ১৫ থেকে ১৮ লাখ যাত্রীর আনাগোনা শিয়ালদহ স্টেশন দিয়ে। নিঃসন্দেহে এই নতুন এসি লোকাল সেই যাত্রীদের জন্য একটি আরামদায়ক বিকল্প হতে চলেছে।