দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান বাঙালি বিদ্বেষের এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করল নয়ডার সেক্টর ৪৪–এর একটি হোটেল। কলকাতার এক প্রযুক্তিবিদ ও তাঁর ১৪ বছর বয়সী ছেলেকে— যে জাতীয় স্তরের স্কেটার— হোটেল কর্তৃপক্ষ থাকার সুযোগ দিল না শুধুমাত্র তারা বাংলাভাষী হওয়ার কারণে।
প্রযুক্তিবিদ বাবার দাবি, তিনি ‘ওয়ো’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দু’দিনের জন্য রুম বুক করেছিলেন। কিন্তু হোটেলের রিসেপশনিস্ট তাঁকে জানায়, বুকিং বাতিল করা হয়েছে। কারণ হিসেবে জানানো হয়, স্থানীয় পুলিশ নাকি নির্দেশ দিয়েছে যে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ, পাঞ্জাব ও জম্মু–কাশ্মীরের কাউকে রুম দেওয়া যাবে না।
‘বাংলাদেশি না হলেও একই জিনিস’— রিসেপশনিস্টের বিতর্কিত মন্তব্য
ভুক্তভোগী জানান— তিনি রিসেপশনিস্টকে বোঝান যে তিনি বাংলাদেশের বাসিন্দা নন, বরং পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছেন। কিন্তু জবাবে রিসেপশনিস্ট বলেন— “বাংলা হোক বা বাংলাদেশ, সব একই” এবং রুম দিতে অস্বীকার করেন।
অসহায় অবস্থায় তিনি বারবার ওয়োর কাস্টমার কেয়ারে ফোন করেন। অবশেষে জানানো হয়, ৭–১০ দিনের মধ্যে টাকা ফেরত দেওয়া হবে। প্রতিযোগিতার স্কেটিং রিঙ্কের কাছেই থাকার পরিকল্পনা থাকলেও, শেষমেষ তাঁকে সেক্টর ৪৯–এর একটি দূরের হোটেলে থাকতে হয়।
OYO-র পক্ষ থেকে ক্ষমা ও হোটেল ব্ল্যাকলিস্ট
ঘটনার পর ওয়োর এক আধিকারিক ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চেয়ে জানান, ‘মীরা ইটারনিটি’ নামক ওই হোটেলটিকে সংস্থার তরফে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ওয়ো স্পষ্ট জানায়, তারা কোনও ধরণের বৈষম্যমূলক নীতি অনুমোদন করে না এবং প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হোটেলগুলিকে এমন নির্দেশিকা কখনও দেয়নি।
নয়ডা পুলিশের পাল্টা বক্তব্য
নয়ডার ডিসিপি যমুনা প্রসাদ জানিয়েছেন— বাংলা বা অন্য কোনও রাজ্যের বাসিন্দাদের থাকার উপর কোনও আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে বাংলাদেশ থেকে আগত অতিথিদের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট ও ভিসা পরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৈধ কাগজপত্র থাকলে এমনকি বাংলাদেশের নাগরিকদেরও থাকার অনুমতি দেওয়া হয়।
এই বক্তব্য রিসেপশনিস্টের দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তাহলে আসল কারণ কি শুধুই পূর্বধারণা ও ভাষাভিত্তিক বিদ্বেষ?
ভারতে ক্রমবর্ধমান বাঙালি বিদ্বেষ
এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারতের নানা প্রান্তে বাঙালিদের ওপর বৈষম্যের অভিযোগ বাড়ছে—
মহারাষ্ট্রে: এক পরিযায়ী শ্রমিকের রহস্যজনক মৃত্যু।
হরিয়ানায়: প্রাণের ভয়ে ১০৩ জন বাঙালি শ্রমিক রাজ্যে ফিরে আসেন।
উত্তর ভারতে: ভাষা ও আঞ্চলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে চাকরি, থাকার জায়গা ও সামাজিক স্বীকৃতিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও ভাষা আন্দোলনের ডাক
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিকবার বাঙালি বিদ্বেষ নিয়ে সরব হয়েছেন। তাঁর বক্তব্য— “কোনও ভাষার অপমান আমি সহ্য করব না। বাংলা হোক, হিন্দি হোক বা অন্য কোনও ভাষা— সম্মান সবার প্রাপ্য।”
তিনি রাজ্যের বাইরে বাংলাভাষীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় ভাষা আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। রাজনৈতিক মহলে এই ইস্যুতে তীব্র তর্ক-বিতর্ক চলছে।
আইনি দিক ও মানবাধিকার প্রসঙ্গ
আইন অনুযায়ী, শুধুমাত্র ভাষা, ধর্ম, অঞ্চল বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কারও প্রবেশাধিকার অস্বীকার করা সংবিধানবিরোধী। এটি ভারতীয় সংবিধানের ১৪ ও ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন, যা সমতা ও বৈষম্যবিরোধী অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে— যদি পুলিশ বা হোটেল এই ধরণের নির্দেশ জারি করে থাকে, তবে তা আইনি প্রক্রিয়ায় চ্যালেঞ্জ করা উচিত।
নয়ডার এই ঘটনা কেবল এক বাবা-ছেলের অপমানের গল্প নয়— এটি ভারতের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক বিদ্বেষ, ভাষাভিত্তিক বৈষম্য এবং সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন। প্রযুক্তিবিদ বাবার প্রশ্ন— “আমি ভারতীয়, কর দিই, দেশের জন্য কাজ করি। তাহলে শুধু বাংলাভাষী বলে কি আমার ছেলের স্বপ্নের পথে বাধা আসবে?”
এই প্রশ্ন শুধু নয়ডার নয়— এটি আজ সমগ্র ভারতের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক চ্যালেঞ্জ।