দক্ষিণ ২৪ পরগনার নরেন্দ্রপুরে ঘটল এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। একাদশ শ্রেণির ছাত্রী সায়ন্তিকা মণ্ডলের (১৭) রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়েছে এলাকায়। অভিযোগ, ঘটনার সময় তাঁর ঘরের ভেতরে উপস্থিত ছিলেন প্রেমিক কৃষ দাস। নাবালিকার নিথর দেহের পাশেই বসে ছিলেন তিনি। এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন এক প্রতিবেশী মহিলা।
পরবর্তীতে প্রতিবেশীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে সায়ন্তিকাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
মৃতা সায়ন্তিকার জীবন
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সায়ন্তিকা চরকলতা এলাকার বাসিন্দা এবং একাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। পড়াশোনায় ভাল এবং শান্ত স্বভাবের মেয়েটি কয়েক মাস ধরে প্রতিবেশী যুবক কৃষ দাসের সঙ্গে প্রণয়ের সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন।
তবে কৃষের বিরুদ্ধে এলাকার মানুষের বহু অভিযোগ ছিল। একাধিকবার তাঁকে নিয়ে অশালীন আচরণের কথা শুনেছেন স্থানীয়রা। এমনকি একাধিক মহিলার সামনে অশ্লীল কাজ করার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। স্থানীয়রা কৃষের পরিবারের কাছে একাধিকবার অভিযোগ করলেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ঘটনার দিন কী হয়েছিল?
পরিবার ও প্রতিবেশীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বুধবার বিকেলে সায়ন্তিকা এবং কৃষ ফোনে কথা বলছিলেন। সেই সময় বাড়িতে একা ছিলেন সায়ন্তিকা। বাবা-মা কাজে গিয়েছিলেন, ছোট বোন টিউশনে ছিল।
অদ্ভুতভাবে ঘটনার কিছুক্ষণ আগে সায়ন্তিকা তাঁর মাকে একটি মেসেজ পাঠান। তাতে নিজের সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট এবং ফোনের পাসওয়ার্ড লিখে দেন। মায়ের কাছে এই মেসেজ পাঠানোর পরই তাঁর মৃত্যু ঘটে বলে অনুমান।
প্রতিবেশী এক মহিলা প্রথমে ঘরে ঢুকে সায়ন্তিকাকে খাটে শোয়ানো অবস্থায় দেখতে পান। তাঁর পাশে বসে ছিলেন কৃষ দাস। এই দৃশ্য দেখে চমকে যান তিনি। এর কিছু পরেই ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়।
পরিবারের অভিযোগ
সায়ন্তিকার পরিবার স্পষ্ট অভিযোগ করেছে যে, কৃষই তাঁদের মেয়েকে খুন করেছে। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কৃষ সায়ন্তিকার উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছিল। নানা অশালীন আচরণের জন্য আগেই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল।
সায়ন্তিকার বাবা জানিয়েছেন— “আমার মেয়ের বয়সই মাত্র ১৭ বছর। জীবনের শুরুতেই তাকে এভাবে হারাতে হবে ভাবিনি। কৃষকে আমরা মেয়ের জীবনে আসতে দিতে চাইনি। কিন্তু সে জোর করে মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। আজ আমার মেয়ে আর বেঁচে নেই।”
কৃষের বাবার বক্তব্য অভিযুক্ত কৃষের বাবা জানিয়েছেন, “আমার ছেলে যদি সত্যিই দোষী হয়, তবে ওর উপযুক্ত শাস্তি হোক। আমি আইনকে সহযোগিতা করব।”
তবে ঘটনার পর থেকেই কৃষ দাস পলাতক। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
পুলিশের তদন্ত
নরেন্দ্রপুর থানায় ইতিমধ্যেই লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন সায়ন্তিকার পরিবার। অভিযোগে খুনের আঙুল উঠেছে কৃষের দিকে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ঘটনাকে তারা গুরুত্ব সহকারে দেখছে। মৃতার দেহ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আসার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। একইসঙ্গে কৃষ দাসকে ধরতে পুলিশ তল্লাশি চালাচ্ছে।
প্রতিবেশীদের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর শোকস্তব্ধ সায়ন্তিকার পরিবার এবং প্রতিবেশীরা। স্থানীয়দের দাবি, কৃষ বহুদিন ধরেই এলাকায় অশান্তি তৈরি করছিল। মহিলাদের হয়রানি করা থেকে শুরু করে অশালীন আচরণ—সবই চলছিল প্রকাশ্যে। এবার যেন তাঁর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়।
এক প্রতিবেশীর কথায়, “আমরা বহুবার কৃষের পরিবারের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলাম। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। আজ সায়ন্তিকার মৃত্যু প্রমাণ করল, কৃষ কতটা বিপজ্জনক।”
নরেন্দ্রপুরের এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল, কিশোর-কিশোরীদের সম্পর্ক ও তার প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে। একজন কিশোরীর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারকেই শোকস্তব্ধ করেনি, গোটা সমাজকে নাড়া দিয়েছে।