প্রিয়াঙ্কা মান্না। কলকাতা সারাদিন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গত দেড় দশক ধরে এক কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে Communist Party of India (Marxist)। একসময়ের শাসকদল আজ বিধানসভা ও লোকসভা—দুই ক্ষেত্রেই শূন্য। ২০০৯ সালে যেখানে সিপিআই(এম)-এর ভোট শতাংশ ছিল ৩৩.১, ২০১৯-এ তা নেমে আসে ৬.৩ শতাংশে। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে আরও কমে দাঁড়ায় ৫.৭ শতাংশে, এবং একটি আসনও জিততে পারেনি দল।
এই দীর্ঘ পতনের পর রাজনৈতিক জমি পুনরুদ্ধারে নতুন পথ খুঁজছে বাম শিবির। আর সেই পথেই এবার অভিনব কৌশল—জনতার মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচনী ইস্তেহার তৈরি।
“বাংলার ভবিষ্যৎ গড়ে তুলুন: আপনার মতামত, আমাদের ইস্তেহার”
এই স্লোগানকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির পক্ষ থেকে নতুন জন-উদ্যোগের সূচনা হয়েছে। দলের বক্তব্য, “এ লড়াই বাঁচার লড়াই, বাংলা বাঁচানোর লড়াই”—আর সেই লড়াইয়ে সাধারণ মানুষ শুধু ভোটার নন, বরং ইস্তেহার নির্মাতাও।
শুক্রবার সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম জানান, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মতামত নিয়ে একটি বিকল্প উন্নয়ন রূপরেখা তৈরি করতে চায় দল। সেই লক্ষ্যেই চালু হয়েছে একটি বিশেষ ওয়েবসাইট—‘বাংলা বাঁচাও ডট কম’। এর উদ্বোধন করেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি।
ডিজিটাল পথে জনসংযোগ
নতুন ওয়েবসাইটে একটি QR কোড যুক্ত পোস্টারের মাধ্যমে নাগরিকদের নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক মতামত জানানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিল্পায়ন, পরিবেশ, নারী সুরক্ষা—প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই সরাসরি মতামত চাওয়া হচ্ছে।
সেলিমের কথায়, “এটা একমুখী ইস্তেহার নয়। আমরা চাই মানুষের অভিজ্ঞতা ও প্রস্তাবের ভিত্তিতেই গড়ে উঠুক যৌথ অঙ্গীকারপত্র।”
দলের দাবি, একের পর এক নির্বাচনী বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ ছিল জনবিচ্ছিন্নতা। সেই দূরত্ব কমাতেই এই ডিজিটাল সংলাপের উদ্যোগ।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে জোর
ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রাথমিক খসড়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে—স্কুল ও কলেজে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিয়মিত করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা শূন্যপদ দ্রুত পূরণ করার দাবি তোলা হয়েছে।
পাশাপাশি শুধুমাত্র বইভিত্তিক শিক্ষার পরিবর্তে কারিগরি ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। লক্ষ্য—শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে বাস্তব যোগ তৈরি করা।
রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে শূন্যপদ পূরণের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ও স্বচ্ছ পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে। অস্থায়ী কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, সামাজিক সুরক্ষা ও বিমা নিশ্চিত করার দাবিও উত্থাপিত হয়েছে।
শ্রমিক ও অসংগঠিত ক্ষেত্র
অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মাসিক মজুরি নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ভিনরাজ্যে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য দুর্ঘটনা বিমা এবং তাঁদের পরিবারের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার নিশ্চয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রামীণ এলাকায় মাইক্রোফিন্যান্স সংস্থার উচ্চ সুদের হার নিয়ন্ত্রণে কড়া আইন প্রণয়নের দাবি তোলা হয়েছে। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে সরকারি ব্যাংক থেকে নামমাত্র সুদে ঋণের ব্যবস্থা করে বেসরকারি ঋণের ফাঁদ থেকে মহিলাদের মুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
শিল্প, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ
স্থানীয় স্তরে ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তুলতে সরকারি সহায়তা ও সহজ ঋণের প্রস্তাব দিয়েছে দল। বন্ধ কলকারখানা চালু করা এবং বড় বিনিয়োগ আকর্ষণের কথাও বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্যক্ষেত্রে গ্রাম ও ব্লক স্তরের হাসপাতালেই উন্নত চিকিৎসা ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নিশ্চিত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যাতে অযথা ‘রেফার কালচার’ কমে। সমস্ত সরকারি হাসপাতালে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষা বিনামূল্যে করার দাবি তোলা হয়েছে।
পরিবেশের প্রশ্নেও স্পষ্ট অবস্থান—প্রতিটি পৌরসভা ও ব্লকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আবর্জনা ব্যবস্থাপনা, শিল্পাঞ্চলে বাধ্যতামূলক বনায়ন এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো।
নারী সুরক্ষা ও স্বনির্ভরতা
মহিলাদের আর্থিক স্বাধীনতার লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে সুদমুক্ত ঋণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদারে বিশেষ ‘পিঙ্ক পুলিশ স্কোয়াড’ মোতায়েনের কথাও বলা হয়েছে।
দলের মতে, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও সামাজিক নিরাপত্তা—এই দুই স্তম্ভেই নারী ক্ষমতায়নের ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে।
আলিমুদ্দিন থেকে জনতার দ্বার
কলকাতার আলিমুদ্দিন স্ট্রিট-এ অবস্থিত রাজ্য দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, ফোন, ইমেল বা সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমেও মতামত পাঠানো যাবে। অর্থাৎ শুধু ডিজিটাল নয়, অফলাইন ব্যবস্থাও খোলা রাখা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে সিপিআই(এম) রাজ্যে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক সংলাপের পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে। “বাংলা বাঁচানোর লড়াই”—এই আবেগঘন বার্তার মাধ্যমে দল তাদের পুরনো সংগঠনিক শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে।
কৌশল নাকি বাস্তব পরিবর্তন?
প্রশ্ন উঠছে—এটি কি শুধুই কৌশল, নাকি সত্যিই দল নিজেদের বদলাতে চাইছে? অতীতে বামফ্রন্ট সরকার দীর্ঘ ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিল। সেই অভিজ্ঞতা ও সমালোচনা—দুটোই এখন দলের সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, সিপিএম এবার সরাসরি মানুষের দরজায় কড়া নাড়ছে। ইস্তেহার তৈরির প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের অংশগ্রহণের আহ্বান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
এখন দেখার, সাধারণ মানুষ কতটা সাড়া দেন। তাঁদের মতামত কতটা গুরুত্ব পায় চূড়ান্ত ইস্তেহারে। এবং সবশেষে—এই জন-উদ্যোগ কি সত্যিই হারানো রাজনৈতিক জমি ফিরে পেতে সিপিএমকে নতুন শক্তি জোগাতে পারে?
ভোটের আগে বাংলার রাজনীতিতে এই পরীক্ষাই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় চমক।