সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
“বাংলাকে সহ্যই করতে পারে না। বাংলা দেখলেই গা জ্বলে, আর লুচির মতো ফোলে।” এভাবেই আরো একবার বাংলা ভাষা ইসুতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নাম না করে বর্তমানে সভা মঞ্চ থেকে তীব্র আক্রমণ করলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
ভিনরাজ্যে ‘জামাই আদর’ করে নিয়ে গিয়ে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্থা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার, বর্ধমান শহরের পরিষেবা প্রদান মঞ্চ থেকে গর্জে উঠলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার মেধার প্রশংসা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলার মেধাকে তাড়াতে পারেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
বর্ধমানের সভা থেকে আরও একবার বাংলা ভাষা নিয়ে সরব মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তুলে আনলেন পাকিস্তান প্রসঙ্গও। কেন্দ্রকে খোঁচা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বললেন, “এখানে নাকি সব বাংলাদেশ হয়ে গিয়েছে। পঞ্জাবের পাশে পাকিস্তান, পাকিস্তানেরও একটা পঞ্জাব রয়েছে, সেকথা তো বলো না। আমাদের পাশে বাংলাদেশ তো আমরা তৈরি করিনি। তোমাদের প্রপিতামহরা করেছে। আমাদের ভাষা যদি এক হয়, আমরা কী করতে পারি?” তার প্রেক্ষাপট বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, “১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা আন্দোলনের পর দেশভাগ হয়। ভারত ভাগ করতে গিয়ে বাংলাকে ভাগ করেছিলেন আর পঞ্জাবকে ভাগ করেছিলেন। আন্দামান সেন্ট্রাল জেল থেকে রেপ্লিকা তুলে এনেছি, দেখা যাতে ৭০০ ওপর বাঙালি গ্রেফতার ছিলেন, যাঁরা স্বাধীনতা আন্দোলন করেন। ১০ শতাংশ ছিলেন পঞ্জাবীরা।”
এদিন মঞ্চ থেকে ফের ভিনরাজ্যে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর আক্রমণের প্রতিবাদে সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। ক্ষোভ প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলার শ্রমিকরা বাইরে গেলেও, বাংলায় ভিনরাজ্যের দেড় কোটি মানুষ রয়েছেন। তাঁদের উপর এই বাংলায় কোনও অত্যাচার করা হয় না।তাঁর কথায়, পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিনরাজ্যে ‘জামাই আদর’ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বলেন, “দয়া করে ওঁদের নিয়ে যাওয়া হয়নি। কেউ সোনার কাজ ভালো করে। কেউ জামা-কাপড় ভালো তৈরি করেন। কেউ কনস্ট্রাকশনের কাজ ভালো পারে। ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে জামাই আদর করে। কিন্তু তাঁদের ভাগ্যে আজ জুটছে লাঞ্চনা, বঞ্চনা, অত্যাচার, অনাচার।” মমতা প্রশ্ন তোলেন, “তাহলে কেন ওড়িশা, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, গুজরাটে বাঙালি শ্রমিকদের হেনস্থা করা হচ্ছে? আমাদের মানুষকে কি মানুষ বলে মনে করেন না?”
পাশাপাশি, মমতা জানান, বাংলার মেধা ছাড়া বিদেশের নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। তিনি বলেন, “মার্কিন প্রেসিডেন্ট গুজরাটের লোকদের কোমরে শিকল বেঁধে পাঠিয়ে দিয়েছে। বাংলার মেধাকে তাড়াতে পারে না।” মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “বাংলার ছাত্রছাত্রীদের মেধা, গবেষকদের মেধা সারা বিশ্ব সম্মান করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট গুজরাটের লোকদের কোমরে শিকল বেঁধে পাঠিয়ে দিয়েছে। বাংলার মেধাকে তাড়াতে পারে না। ওদের ছাড়া হার্ভার্ড, কেমব্রিজ চলবে না। নাসা থেকে ভাষা ওঁরাই আছে।”
তাঁর কথায়, “আমাদের রাজ্যে ২২ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক আছে যারা বাইরে আছে। এমনি দয়া করে নিয়ে যায়নি। তাঁদের ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে জামাই আদর করে। কারণ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁরা দক্ষ। অথচ তাঁদের কপালে এখন লাঞ্ছনা, অত্যাচার জুটছে।”

শ্রমশ্রী প্রকল্পের সূচনা করলেন মুখ্যমন্ত্রী
সদ্য ঘোষিত প্রকল্প শ্রমশ্রীর সূচনা করলেন মুখ্যমন্ত্রী। সভামঞ্চ থেকে ফের একবার পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ভিনরাজ্য থেকে বাংলায় পরিযায়ী শ্রমিকরা ফিরলেই ৫ হাজার টাকা করে অর্থ সাহায্য পাবেন। একইসঙ্গে শ্রমিকের সন্তানদের পড়াশোনা থেকে সমস্ত সরকারি প্রকল্প আওতায় তাঁদের নিয়ে আসা হবে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ”আমি কর্মশ্রী প্রকল্প করেছি। ৭৮ লক্ষ লোককে জব কার্ড দেওয়া হয়েছে এই প্রকল্পে। ”
দুর্গা পুজোর জন্য গান মমতার
বর্ধমানে সভামঞ্চ থেকে তিনি জানান, তাঁকে দুর্গা পুজোর জন্য গান লিখতে হয়। এই বছর ইতিমধ্যেই এক পুজো মণ্ডপের জন্য তিনি গান লিখেছেন। সেই পুজো মণ্ডোপের থিম ও গানের প্রথম লাইন জানিয়েছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, গানের প্রথম লাইন – “ধনধান্য ভরে মা এসেছেন ঘরে।”
তিনি বলেন, “আমাকে পুজোয় কিছু গান লিখতে হয়। কলকাতার একটা প্যান্ডেল সব শস্য দিয়ে প্যান্ডেল করছে। গানটা আমিই তৈরি করে দিয়েছি। প্রথন লাইন হল, ‘ধনধান্যে ভরে, মা এসেছে ঘরে’। বর্ধমান কিন্তু ধান উৎপাদনে প্রথম। অভিনন্দন, বাংলা এবার ধান উৎপাদনে প্রথম। এই মাটিকে সম্মান জানাই।”
বাংলায় উন্নয়নের খতিয়ান
মঙ্গলবার বর্ধমানের সভামঞ্চ থেকে ২০১১ সালে বাংলার ক্ষমতায় আসার পর থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার রাজ্যের উন্নয়নে কি কি কর্মকান্ড করেছে তার খতিয়ান তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ৭২ হাজারের বেশি লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাবেন। বর্ধমানে সরকারি প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস এবং পরিষেবা প্রদান অনুষ্ঠানে জানালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একইসঙ্গে জেলার জন্য আরও একাধিক প্রকল্পের কথা জানান। এদিন বর্ধমানের প্রশাসনিক সভায় একগুচ্ছ প্রকল্পের কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বলেন, “৫ হাজার ছাত্রছাত্রীকে সাইকেল দেওয়া হয়েছে। ২৫০০-এর বেশি মানুষকে বাংলার বাড়ি প্রকল্পে সাহায্য। প্রবল বৃষ্টিপাত, ডিভিসি, পাঞ্চেত, মাইথনের ছাড়া জলে বিভিন্ন জেলা ভাসছে। মেমারি, গুসকরার বিভিন্ন স্কুলে সায়েন্স ল্যাব, লাইব্রেরি তৈরি হয়েছে। পূর্ব বর্ধমান জেলার ৫৪ টি স্কুলে স্মার্ট ক্লাসরুম হয়েছে। ১৫ টি আদিবাসী কমিউনিটি সেন্টার তৈরি করা হয়েছে। বর্ধমানের বিভিন্ন জায়গায় ৪৯ টি বাসস্ট্যান্ড তৈরি হয়েছে। কৃষি ও শিল্পকে মেলাতে চেয়েছিলাম। কৃষি সেতু আছে, শিল্প সেতুও তৈরি হচ্ছে ৩৪৭ কোটি ১১ লক্ষ টাকায়। রানিগঞ্জ, আসানসোলে পৌরনিগমের প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ। কাঁকসা, সালানপুরে রাস্তা নির্মাণের জন্য প্রায় ৯ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। তিনটি ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। দুর্গাপুরে কমিউনিটি সেন্টার তৈরি করা হচ্ছে। বহু রাস্তা নির্মাণ ও স্বাস্থ্য প্রকল্পের কাজে শিলান্যাস হয়েছে।”