শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
লন্ডনে আবারও অভিবাসন বিরোধী উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। “Unite the Kingdom” নামে আয়োজিত এক বিশাল মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ। তাদের প্রধান দাবি—বিদেশি অভিবাসনের ঢল থামাতে হবে এবং দেশকে “পুনরুদ্ধার” করতে হবে। এই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেন কট্টর দক্ষিণপন্থী নেতা স্টিফেন ইয়াক্সলি-লেনন ওরফে টমি রবিনসন, যিনি মুসলিম বিরোধী মন্তব্যের জন্য আগেই পরিচিত।
সহিংসতায় রূপ নেয় বিক্ষোভ
শুরুতে মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। রাস্তায় ভাঙচুর, পুলিশের উপর আক্রমণ—সবই ঘটতে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশের দিকে কাচের বোতল, ভারী বস্তু ছোড়া হয়। এমনকি দল বেঁধে পুলিশ অফিসারদের লাথি-ঘুষিও মারা হয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ২৬ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন, যার মধ্যে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
টমি রবিনসনের বার্তা
বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে টমি রবিনসন বলেন—
“এদেশের আদালতে এখন ব্রিটিশ নাগরিক, দেশের প্রতিষ্ঠাতাদের চেয়ে অভিবাসীদের বেশি অধিকার।”
এই বক্তব্যে জনতার মধ্যে উন্মাদনা আরও বাড়ে। অনেকেই মনে করছেন, এরকম মন্তব্য কেবল বিভাজন ও ঘৃণার আগুনকে উসকে দিচ্ছে।
ইলন মাস্কের বিতর্কিত বক্তৃতা
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন পৃথিবীর অন্যতম ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্ক। তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মিছিলে বক্তব্য রাখেন। তাঁর কথায়—
“ব্রিটিশ হওয়ার মধ্যে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য রয়েছে। কিন্তু আমি ব্রিটেনকে ধ্বংস হতে দেখছি। ভাঙন দিয়ে শুরু হয়েছিল, কিন্তু ব্যাপক ও অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের ফলে এখন দ্রুতগতিতে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে। এভাবে চললে, আপনাদের উপর হিংসা নেমে আসবে। আর কোনও উপায় থাকবে না। পরিস্থিতি গুরুতর হতে চলেছে। আপনারা চান বা না চান, হিংসা নেমে আসবেই। হয় প্রত্যাঘ্যাত করতে হবে, নইলে মরতে হবে।”
মাস্ক আরও বলেন, সরকারকে এখনই বদলানো উচিত। তাঁর দাবি, পার্লামেন্ট ভেঙে নতুন নির্বাচন হওয়া জরুরি।
এই বক্তব্য ঘিরে ব্রিটেনে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, এমন মন্তব্য আসলে ঘৃণা ও সহিংসতার পথেই জনতাকে ঠেলে দিচ্ছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কির স্টার্মার তীব্র ভাষায় নিন্দা করেন এই সহিংসতা ও বক্তৃতাকে। তিনি বলেন—
“শান্তিপূর্ণ মিছিলের অধিকার রয়েছে নাগরিকদের। এটাই আমাদের দেশের মূল্যবোধ। কিন্তু পুলিশের উপর হামলা, গায়ের রংয়ের জন্য সাধারণ মানুষের উপর হামলা মেনে নেব না। সহিষ্ণুতা, বৈচিত্র এবং সম্মানের উপর দাঁড়িয়ে ব্রিটেন। আমাদের পতাকায় বৈচিত্র রয়েছে। হিংসা, ভীতিপ্রদর্শন এবং মেরুকরণের সামনে কখনও মাথা নোয়াব না।”
অন্যদিকে, ব্রিটেনের বাণিজ্যসচিব পিটার কাইল বলেন—
“আমাদের সমাজে যে মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়। উনি (ইলন) নির্বোধের মতো কথা বলেছেন, যা একেবারেই অশোভনীয়।”

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
তবে শুধু ব্রিটেনই নয়, চলতি বছরে একাধিক দেশে অভিবাসন বিরোধী বিক্ষোভ দেখা গিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মেক্সিকো সীমান্তে অভিবাসীদের প্রবেশ নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। অস্ট্রেলিয়াতেও হাজার হাজার মানুষ অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছেন। এমনকি ভারতীয় অভিবাসীদের বিরুদ্ধেও প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। ফলে, স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে অভিবাসন ইস্যু কেবল ব্রিটেনেই নয়, গোটা বিশ্বেই বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
বিশ্লেষণ ও সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের আন্দোলনের পেছনে কাজ করছে অর্থনৈতিক চাপ, চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা, এবং জাতীয় পরিচয় রক্ষার ভয়। “Great Replacement” তত্ত্ব—যেখানে বলা হচ্ছে অভিবাসনের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে—তা দক্ষিণপন্থীদের হাতে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আগামী দিনে অভিবাসন ইস্যু ঘিরে ব্রিটিশ রাজনীতি আরও বিভাজিত হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর চাপ বাড়বে এবং সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে একই সঙ্গে সামাজিক সংগঠনগুলো বৈচিত্র ও সহিষ্ণুতার পক্ষে আন্দোলন জোরদার করবে বলেই অনুমান করা হচ্ছে।