সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
এ পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি। কবির এই প্রতিশ্রুতি বাংলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করার জন্য চলতি বছরের বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন বাংলাকে প্লাস্টিক মুক্ত করে তুলতে হবে। আর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই ঘোষণা অনুযায়ী গোটা রাজ্যকে প্লাস্টিক এবং প্লাস্টিক বর্জ্য মুক্ত করার জন্য একের পর এক প্রকল্প হাতে নিয়েছেন রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্ৰামোন্নয়ন মন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার।
পরিসংখ্যান বলে, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৪৫ কোটি টন প্লাস্টিক বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে। প্লাস্টিক বর্জ্য ৪০০ বছর পর্যন্ত পরিবেশে বিরাজ করে জীব ও প্রকৃতির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। উন্নত দেশে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থাকায় ব্যবহৃত প্লাস্টিক পরিবেশে কম ছড়িয়ে পড়ে। তবে চীনসহ এশিয়ার দেশগুলো বিশ্বের ৫১ শতাংশ প্লাস্টিক দূষণকারী। বর্তমান পৃথিবীর মানুষের দৈনন্দিন জীবন প্লাস্টিক ছাড়া কল্পনাতীত। প্রায় সকল ধরনের মোড়ক ও বোতল প্লাস্টিকের তৈরি। ব্যবহৃত প্লাস্টিকের কিছু অংশ রিসাইকেল করা হলেও বেশিরভাগই বর্জ্য হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে। যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে সাগরের তলদেশ থেকে মাউন্ট এভারেস্ট পর্যন্ত পৃথিবীর সর্বত্র, এমনকি মেরু অঞ্চলেও প্লাস্টিক বর্জ্য ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যেই পৃথিবীর মাটি, জল, বায়ুমণ্ডল, বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও মানব স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এই প্লাস্টিক দূষণ।
ভয়ংকর এই প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্ৰামোন্নয়ন দপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত হলো রাজ্যস্তরের কর্মশালা ও প্রদর্শনী। এই কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য ছিল সারা রাজ্যে কীভাবে কার্যকরভাবে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা যায় তা নিয়ে আলোচনা ও পরিকল্পনা তৈরি করা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ও গ্ৰামোন্নয়ন মন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার, দপ্তরের সচিব পি উলগানাথন, স্বচ্ছ ভারত মিশন-গ্রামীণের ডিরেক্টর, পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের প্রতিনিধি, ইউনিসেফ এবং ইউএনওপস-এর প্রতিনিধিরা। এছাড়াও জেলার স্যানিটেশন নোডাল অফিসার, ব্লক সমন্বয়ক, স্বনির্ভর গোষ্ঠী, পুনর্ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান এবং পরিবেশ সচেতন সংগঠনগুলি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।
এই কর্মশালার মূল ফোকাস ছিল গ্রামীণ ও শহুরে স্তরে প্লাস্টিক বর্জ্যের ব্যবহার হ্রাস, পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশ-বান্ধব বিকল্প প্রচার করা। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সংস্থার তরফ থেকে স্টল প্রদর্শিত হয়, যেখানে দেখানো হয়— কীভাবে ঘরোয়া স্তরে প্লাস্টিক আলাদা করে সংগ্রহ করা যায়। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যে রূপান্তর।জৈব-বিয়োজ্য ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিং উপকরণ ব্যবহার এবং স্থানীয় স্তরে প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে ইট ও নির্মাণসামগ্রী তৈরি।
রাজ্যের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১২০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার মধ্যে মাত্র ৪০ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। এই অবস্থার উন্নতির জন্য সম্প্রতি রাজ্য সরকার প্রতিটি জেলার ব্লক স্তরে প্লাস্টিক ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ইউনিট চালু করেছে। এসব ইউনিটের মাধ্যমে সংগ্রহ, বাছাই ও পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়া জোরদার করা হচ্ছে। এছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি চালানো হচ্ছে যেখানে ছাত্রছাত্রী, যুব সমাজ এবং স্থানীয় পঞ্চায়েত সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে কাপড়ের ব্যাগ, মাটির তৈরি পাত্র ও বাঁশকাঠির ব্যবহার উৎসাহিত করা হচ্ছে। এই কর্মশালার মাধ্যমে জেলার সেরা উদ্যোগগুলো রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্য সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ২০২৭ সালের মধ্যে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করার জন্য আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা কর্মশালায় স্পষ্ট করে বলেন, পরিবেশ রক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক দূষণ এক ভয়াবহ সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে আগামী দিনে নদী, জলাভূমি এবং কৃষিজমিতে এর প্রভাব মারাত্মক আকার ধারণ করবে।
এদিনের অনুষ্ঠানে ৬টি শ্রেষ্ঠ কার্যক্রমকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল গ্রামীণ মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর উদ্যোগে প্লাস্টিক থেকে থলে তৈরি, জেলার তরুণ উদ্যোক্তাদের নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্জ্য কমানোর প্রয়াস, এবং প্লাস্টিক আলাদা করার জন্য ব্লক পর্যায়ে চালু হওয়া বিশেষ কর্মসূচি।