সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘আমরা ধর্মের প্রতি আমি আস্থাশীল, অন্য ধর্মের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল। তবে কেউ যদি এই মসজিদের ইট খুলতে আসে… শহিদ হব তাও এর একটা ইটও খুলতে দেব না। মুর্শিদাবাদের মাটিতে উত্তরপ্রদেশ বা মধ্যপ্রদেশ থেকে এসে কেউ ইট খোলার চেষ্টা করবে, হতে দেব না।’ দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের মধ্যে আজ নিজের পূর্ব ঘোষণা মত মুর্শিদাবাদের বেলডাঙাতে বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে এমন হুঙ্কার দিলেন ভরতপুরের বহিষ্কৃত তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। এই মঞ্চ থেকেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন হুমায়ুন। সংখ্যালঘুদের ভোটে জিতে মমতার চরম অহঙ্কার হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, এই দম্ভ তিনি চূর্ণ করবেন এবং মমতাকে ‘প্রাক্তন’ করে ছাড়বেন।
ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীর এই উপলক্ষে জানান, তিনি রাজ্য সরকারের অর্থে মসজিদ নির্মাণ করবেন না, কারণ তাতে এর পবিত্রতা নষ্ট হবে। মসজিদ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুর, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি, দুই মেদিনীপুর সহ বিভিন্ন জেলার সাধারণ মানুষ আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে দেবেন। অনেক বাধা থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিকভাবে তিন কাঠা জমির ওপর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলো। বাকি ২৫ বিঘা জমিতে হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং পার্ক তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এই পুরো প্রকল্পের জন্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বাজেট ধার্য করা হয়েছে, যার মধ্যে শুধু মসজিদ নয়, স্কুল, পার্ক ও হোটেলও থাকবে।
মসজিদ নির্মাণের জন্য মোট বাজেট ৩০০ কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন হুমায়ুন কবীর। কিন্তু এত টাকার জোগান কীভাবে সম্ভব, সেই প্রশ্ন ওঠার পরপরই অনুদানের কথা জানিয়েছিলেন তিনি। এদিন ভিত্তিস্থাপনের অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে হুমায়ুন ফের জানান, ভারতের এক অনেক বড় শিল্পপতি তাঁকে ফোন করে আশ্বাস দিয়েছেন, মসজিদ নির্মাণে ৮০ কোটি টাকা দেবেন। এই পরিপ্রেক্ষিতেই তাঁর হুঙ্কার, ‘এরপর কে রুখবে বাবরি মসজিদ নির্মাণ, কে আটকাবে হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ?’ হুমায়ুন কবীর জানান, মসজিদের পাশাপাশি ওই জমিতেই সঙ্গে মেডিক্যাল কলেজ হবে। হাসপাতাল হবে। হোটেল হবে। হেলিপ্যাড হবে। মোট বাজেট ৩০০ কোটি। এক শিল্পপতি দিচ্ছেন ৮০ কোটি টাকা। যদিও তাঁর নাম প্রকাশ করেননি হুমায়ুন কবীর। একইসঙ্গে জানান, ‘২২ তারিখ নতুন করে রাজনীতির কথা হবে। সেদিন অনেক নতুন কথা বলব নতুন তথ্য দেব।’
এদিন মুর্শিদাবাদে হুমায়ুন কবীরের বাবরি মসজিদের শিলান্যাস করতে সৌদি আরব থেকে এসেছেন ইসলাম ধর্মগুরু হজরত মাওলানা মুফতি সুফিয়ান। মদিনা থেকে এসেছেন আরেকজন ধর্মগুরু শেখ আবদুল্লা। এর পাশাপাশি, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে সাধারণ মানুষকে যে যার সাধ্যমতো কেউ দুটো, কেউ চারটে, কাউকে ৬টা ইট নিয়ে সভাস্থলে আসতে দেখা যায়। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে দান অর্থাৎ ইমারতি খয়রাত হিসেবে এই ইট এনেছেন তাঁরা। স্থানীয় এক ডাক্তার দেন ১ কোটি টাকা। হুমায়ুনের বাবরি মসজিদের শিলান্যাস উপলক্ষে আঁটোসাঁটো নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে শিলান্যাস এলাকার আইন শৃঙ্খলার দায়িত্বে হরিহরপাড়া থানার আইসি। তিনি ভোর থেকেই স্পটে আছেন। সঙ্গে পুলিশের বিশাল বাহিনী। গোটা রেজিনগর এলাকাকে ৮ টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। প্রতি সেক্টরে একজন করে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার আধিকারিক। ১২ নম্বর জাতীয় সড়কে প্রতি ৫ কিলোমিটার অন্তর হাফ কোম্পানি করে কেন্দ্রীয় আধা সেনা মোতায়েন। একদম অন্যরকম ছবি বেলডাঙায়। রয়েছে রাজ্য পুলিশের মহিলা কমব্যাট ফোর্স উইনার্সও। পুলিশ আজ টোটো বের করারও অনুমতি দেয়নি ভিড়ের কারণে।

হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘যে আল্লাকে ভালোবাসে তার কাজে সাফল্য আসে।অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ নাকি বিতর্কিত জমিতে ছিল। ওখানে নাকি রামের জন্ম হয়েছিল… এখন দেশে ৪০ কোটি মুসলিম। রাজ্যে ৪ কোটি মুসলিম। সেখানে একটা মসজিদ করতে পারব না? ৩৩ বছর আগে মুসলিমদের মনে যে আঘাত লেগেছিল আজ সেই ক্ষতে সামান্য একটা প্রলেপ। এক শ্রেণির মানুষ এটা হতে দিতে চাইনি। বলা হয়েছে, বাবরি মসজিদ করলে আমার মাথার দাম ১ কোটি টাকা হবে! আমি সতর্ক করছি আমার কেশাগ্র স্পর্শ করে দেখান। আমি কোনও অসাংবিধানিক কাজ করছি না। ধর্মস্থান তৈরির অধিকার একটি সংবিধান বর্ণিত অধিকার। বাবরি মসজিদ হবেই। হবেই। হবেই।’