শোভন গায়েন। কলকাতা সারাদিন।
‘বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যে অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে এবং গরিব কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তাঁর অভিযোগ, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার ক্ষেত্রেও তৃণমূল সরকার বাধা দিচ্ছে এবং বিএসএফকে জমি দেয়নি।’ এভাবেই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বাংলার মানুষের কাছে প্রতিশ্রুতি দিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তাঁর মতে, ২০২৬ সালের ভোট মূলত অনুপ্রবেশ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ভোট হবে। দুর্নীতি প্রসঙ্গে অমিত শাহ বলেন, ‘তৃণমূলের একাধিক নেতা ও মন্ত্রীর বাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছে।’ পার্থ চট্টোপাধ্যায়, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, অনুব্রত মণ্ডল-সহ বহু নেতার নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আপনারা বলছেন বাংলায় দুর্নীতি নেই? নিয়োগ দুর্নীতি থেকে পুরসভা, সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতির ছায়া।’
মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়েও রাজ্য সরকারকে আক্রমণ করেন শাহ। আরজি কর, দুর্গাপুর মেডিক্যাল কলেজ ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারী নির্যাতনের ঘটনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তৃণমূল সরকার বাংলার মানুষকে সুশাসন দিতে ব্যর্থ। মমতার আমলে বাংলার অর্থনৈতিক অবনতির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘তৃণমূলের আমলে রাজ্য থেকে একের পর এক শিল্প সংস্থা চলে যাচ্ছে এবং পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে।’
আজ তিনি কলকাতায় সাংবাদিক বৈঠক করেন। সেখানে তিনি বলেন যে, গত ১৫ বছরে পশ্চিমবঙ্গ ভয়, দুর্নীতি এবং অপশাসনের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যের মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। আর আগামী বিধানসভা নির্বাচনে সেই পরিবর্তনের রায়ই দেবে। অমিত শাহ বলেন যে, আগামী এপ্রিল মাসেই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন। আর সেই ভোটকে সামনে রেখে রাজ্যের মানুষের মনোভাব একদম স্পষ্ট। তাঁর দাবি, ‘যে সরকার উন্নয়ন, সংস্কৃতি রক্ষা এবং গরিব মানুষের স্বার্থে কাজ করে, আসন্ন বিধানসভা ভোটে বাংলার মানুষজন সেই সরকার গঠনের পক্ষে রায় দিতে প্রস্তুত আছে। ভয়, দুর্নীতি এবং অপশাসনের রাজনীতি থেকে মানুষ মুক্তি চায়।’
২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি আরও বলেন, ‘বিজেপি যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে বাংলার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা হবে। পাশাপাশি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী দেশছাড়া করা হবে। এই বিষয়ে কোনও রকম আপস করা হবে না।’ স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভাবনায় নতুন করে বাংলা গড়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। সিএএ প্রসঙ্গেও তৃণমূলকে আক্রমণ করেছেন অমিত শাহ।
তিনি বলেন যে, কেন্দ্রের জনকল্যাণমূলক এই কর্মসূচির বিরোধিতা করে তৃণমূল সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘রাজ্যে প্রকৃত উন্নয়ন থমকে গিয়েছে। কেন্দ্রের বিভিন্ন জনকল্যাণ মূলক প্রকল্প আটকে যাচ্ছে। সেই কারণে সাধারণ মানুষ প্রকল্পের সুফল পাচ্ছেন না।’
তবে শাহর এই বার্তার পরেই আবার উঠে আসে পুরনো প্রশ্ন। বিজেপি কী সত্যিই বাংলা জিততে চায়, নাকি তৃণমূলের সঙ্গে অন্য কোনও বোঝাপড়া রয়েছে? রাজনৈতিক মহলের একাংশ দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে, ভোটের আগে বিজেপি বড় বড় কথা বললেও ভোটের পরে বিজেপি সেরকম লড়াই করে না। এই থেকেই ‘সেটিং তত্ত্ব’-এর কথাও উঠে আসে।
এই প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিয়েছেন অমিত শাহ। সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বলেন যে, ‘আমরা যখন বলছি ২০২৬-এ বিজেপি সরকার গড়বে, তার মানে এর পিছনে যথেষ্ট কোনও কারণ আছে।’ এরপর একে একে ভোটের অঙ্ক তুলে ধরেন তিনি। শাহ জানান, ‘২০১৪ সালে বিজেপির ভোট ছিল ১৭ শতাংশ, ২০১৬-তে বিধানসভায় ৩টি আসন, ২০১৯ লোকসভায় ৪১ শতাংশ ভোট, ২০২১ বিধানসভায় ৭৭টি আসন এবং ২০২৪ লোকসভায় প্রায় ৩৯ শতাংশ ভোট বিজেপি পেয়েছে।’
তিনি দাবি করেন যে, এই ধারাবাহিক বৃদ্ধিই প্রমাণ করে দেয় যে বিজেপিই ধীরে ধীরে বাংলার প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠছে। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, তৃণমূলের সঙ্গে কোনও ‘সেটিং’-এর প্রশ্নই নেই। তাঁর কথায়, ‘কংগ্রেস এখন শূন্য, বামদের তো ভোটই নেই। আমরাই এখন প্রধান বিরোধী দল। তাই স্বাভাবিকভাবেই পরের ধাপে বিজেপি সরকার গঠন হবে।’

বিজেপি ক্ষমতায় এলে উন্নয়ন এবং সুশাসন হওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন অমিত শাহ। তাঁর দাবি, ‘বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির দিকে তাকালেই উন্নয়নের ছবি স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। আর এই একই মডেল বাংলায় প্রয়োগ করাই তাঁদের লক্ষ্য। বাঙালি মনীষীদের স্বপ্নের বাংলা গড়তে চাই আমরা।’ অন্যদিকে অমিত শাহের এই বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাঁকুড়ার জনসভা থেকে তিনি কটাক্ষ করে বলেন যে, ‘বিজেপি সোনার বাংলা গড়ার কথা বলছে, অথচ অন্য রাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর অত্যাচার হচ্ছে। এইরকম পরিস্থিতিতে বিজেপি কীভাবে বাংলার উন্নয়নের কথা বলে?’