সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘হোয়াটসঅ্যাপে নির্দেশিকা পাঠানো যাবে না। যে কোনও প্রশাসনিক নির্দেশ পাঠাতে হবে লিখিতভাবে। লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র তালিকা প্রকাশ করতে হবে। শুনানিতে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড গ্ৰাহ্য করতে হবে।’ বাংলার ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে তৃনমূল ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দায়ের করা মামলায় ঐতিহাসিক নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট।
গত নভেম্বর থেকে বাংলায় এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকেই গোটা প্রক্রিয়ায় একের পর এক সমস্যা রয়েছে বলে সাধারণ মানুষের হয়রানি হচ্ছে জানিয়ে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে একাধিকবার চিঠি দিয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু তাতে কোন কর্ণপাত করেনি জাতীয় নির্বাচন কমিশন। এর পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করে তৃণমূল এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার। আর সেই মামলার শুনানি ছিল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চে।
লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র নামে বাংলায় প্রায় এক কোটি 36 লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছিল তৃণমূল। এই তালিকায় রয়েছে তারা জানতেও পারছেন না বলে অভিযোগ তোলা হয়েছিল। তার প্রেক্ষিতেই শীর্ষ আদালতের নির্দেশে জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট তালিকা প্রকাশ্যে টাঙিয়ে রাখতে হবে। পাশাপাশি শুনানির সময় কারও কাছ থেকে নথি জমা নেওয়া হলে, তার স্বীকৃতি হিসেবে রসিদ দেওয়াও বাধ্যতামূলক বলে স্পষ্ট করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, কমিশনকে গ্রাম পঞ্চায়েত, ব্লক ও ওয়ার্ড অফিসে সংশ্লিষ্ট তালিকা প্রকাশ্যে টাঙিয়ে রাখতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি ব্লক অফিসে আলাদা কাউন্টার বা নির্দিষ্ট অফিস খুলতে হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ নথি জমা দিতে পারবেন এবং আপত্তি জানাতে পারবেন।
পশ্চিমবঙ্গে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্টে শুনানিতে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি ও পদ্ধতি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠে এল। আবেদনকারীদের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী কপিল সিব্বাল জানান, শুনানির জন্য অনুমোদিত ভেন্যুর সংখ্যা মাত্র ৩০০। অথচ প্রয়োজন অন্তত ১৯০০টি।
সোমবার সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, হিয়ারিংয়ে রাজনৈতিক দলের স্বীকৃত প্রতিনিধিকে উপস্থিত থাকতে দিতে হবে। হিয়ারিং করতে হবে ব্লক ও পঞ্চায়েত অফিসে। তালিকা প্রকাশের ১০ দিনের মধ্যে যদি কেউ গ্রহণযোগ্য নথি জমা না দেন, তা হলে তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া যেতে পারে। সময়সীমা পার হলেও তালিকা প্রকাশ করতে হবে। হিয়ারিংয়ে নথি জমা দেওয়ার পর আবেদনকারীদের রিসিভড-প্রমাণপত্র (যাচাই হয়নি লেখা) দিতে হবে।
কপিল সিব্বল জানান, নামের বানানে ভুল থাকলেই লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সির নোটিস পাঠানো হচ্ছে।
কমিশন পাল্টা বলে, নামের বানানে ভুল থাকলে কাউকেই নোটিস পাঠানো হচ্ছে না। শুধুমাত্র বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের বয়সের ফারাক ১৪/১৬ বছরের কম হলেই যাচাইয়ের জন্য নোটিস পাঠানো হচ্ছে। সব শুনে কোর্ট বলে, ভারতের মতো দেশে কীভাবে এই যুক্তি দিচ্ছেন? মনে রাখতে হবে, এখানে বাল্যবিবাহ ছিল। কিছু জায়গায় এখনও আছে। সিব্বল দাবি করেন, লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সির পাশাপাশি হিয়ারিংয়ের শিডিউল দেওয়া হোক। তাঁর বক্তব্য, বাবা-ঠাকুরদা ও সন্তানের বয়সের ব্যবধানকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ হিসেবে দেখিয়ে ভোটারদের নাম নিয়ে আপত্তি তোলা হচ্ছে। অথচ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম দীর্ঘদিন ধরেই ভোটার তালিকায় রয়েছে। তিনি আদালতের কাছে আবেদন জানান, এ ধরনের সমস্ত তথাকথিত অসঙ্গতির পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করা হোক এবং তারপর শুনানির নির্দিষ্ট দিন ধার্য করা হোক। বানান বিভ্রাট নিয়েও আপত্তি তোলেন তিনি। সিব্বলের বক্তব্য, গাঙ্গুলি বা দত্তের মতো পদবির ভিন্ন বানান দেখিয়ে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, নোটিস জারির মূল উদ্দেশ্যই ভোটার তালিকা থেকে নাম ছাঁটাই। এই প্রসঙ্গে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি প্রশ্ন তোলেন, মা ও সন্তানের মধ্যে ১৫ বছরের ব্যবধানকে কীভাবে অযৌক্তিক বলা যায়। আদালতের মন্তব্য, বাল্যবিবাহ এই দেশের বাস্তবতা।
প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের নির্দেশ, যে সব ভোটাররা শুনানিতে ডাক পাচ্ছেন, তাঁরা তাঁদের পক্ষ থেকে শুনানিতে সওয়াল করার জন্য কারও সাহায্য নিতে পারেন। আত্মীয়, বন্ধু, প্রতিবেশীদের, এমনকী বিএলএ-দেরও সাহায্য নিতে পারেন বলে নির্দেশে জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে স্বাক্ষর অথবা টিপসই দিয়ে চিঠি সহ অথরাইজেশন করতে হবে। অর্থাৎ অথরাইজেশন থাকলে, বিএলএ কোনও ভোটারের হয়ে হাজির হতে পারবেন হিয়ারিং-এ। আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ওই রায় প্রসঙ্গে বলেন, ‘বিএলএ-দের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছিল না। কমিশনের অনেক আপত্তি ছিল। কোর্ট বলেছে, যে কোনও ভোটার শুনানিতে কারও সাহায্য নিতে পারে।’ বিএলএ-দেরও সাহায্য নেওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তৃণমূল এই রায়কে বড় জয় হিসেবে দেখছে।
অন্যদিকে, ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে আমজনতার দুশ্চিন্তা কমাতে বড় নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এখন থেকে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডকেও এসআইআর শুনানিতে বৈধ নথি হিসেবে গণ্য করতে হবে। এর আগে জাতীয় নির্বাচন কমিশন এই নথি গ্রহণে আপত্তি জানিয়েছিল, যা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক তৈরি হয়। সেই আপত্তিতে জল ঢেলে আদালতের পর্যবেক্ষণ, যেহেতু অ্যাডমিট কার্ডে জন্মতারিখ উল্লেখ থাকে, তাই এটি প্রামাণ্য নথি হিসেবে গ্রাহ্য হবে।
এই প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে চালাতে রাজ্য সরকারকে পর্যাপ্ত সংখ্যক কর্মী মোতায়েন করতে বলেছে সুপ্রিম কোর্ট। বলা হয়েছে, ওই কর্মীরা পঞ্চায়েত ভবন ও ব্লক অফিসে বসে ভোটারদের বক্তব্য শুনবেন। পাশাপাশি, প্রতিটি জেলার জেলাশাসককে এই নির্দেশ কঠোর ভাবে কার্যকর করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুরো প্রক্রিয়া চলাকালীন রাজ্যকে উপযুক্ত পুলিশি ও আইন-শৃঙ্খলার ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে বলে জানিয়েছে শীর্ষ আদালত। শুধু তাই নয়, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নথি গ্রহণ বা শুনানি করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অবশ্যই রসিদ দিতে হবে এবং সিদ্ধান্তের কারণ লিখিত ভাবে জানাতে হবে বলেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে দুই সপ্তাহ পরে।