রফিকুল ইসলাম। কলকাতা সারাদিন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং নেতৃত্বের পালাবদলের নাটকীয় অধ্যায় পেরিয়ে অবশেষে স্থায়ী সরকার পেতে চলেছে বাংলাদেশ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করতে চলেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি একাই জিতেছে ১৮১টি আসনে। জোটসঙ্গী দলগুলি মিলিয়ে সংখ্যাটা আরও বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি নির্বাচনী ফল নয়—বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী মোড়।
অবাধ ভোট, নতুন প্রত্যাশা
গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল চরম মেরুকরণের শিকার। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ ছিল, পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোতে সাধারণ মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেননি। কিন্তু এবারের নির্বাচনকে অনেকেই দেখছেন নতুন সূচনার প্রতীক হিসেবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দাবি করেছেন, এই নির্বাচন দেশের ইতিহাসে অন্যতম শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর। ভোটকেন্দ্রগুলোতে দীর্ঘ লাইন, তরুণ ভোটারদের উৎসাহ এবং তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ—সব মিলিয়ে গণতন্ত্রের নতুন বার্তা দিয়েছে।
হাসিনা অধ্যায়ের অবসান
টানা ১৭ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের জেরে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। ছাত্র-যুব সমাজের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ উঠেছিল ‘আয়না ঘর’-এর মতো গোপন নির্যাতন কেন্দ্র, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং ভিন্নমত দমনের বিরুদ্ধে।
হাসিনা সরকারের পতনের পরই দেশে তৈরি হয় নতুন নেতৃত্বের চাহিদা। সেই আবহেই প্রায় দুই দশক পর লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। তাঁর প্রত্যাবর্তন বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি করে, যার প্রতিফলন দেখা গেল ভোটের ফলাফলে।
৩৫ বছর পর নতুন প্রধানমন্ত্রী
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ‘হাসিনা বনাম খালেদা’ সমীকরণই ছিল মূল কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৯০-এর পর থেকে প্রধানমন্ত্রীর পদ ঘুরে ফিরেছে এই দুই নেত্রীর হাতেই—খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা।
তবে এবার সেই অধ্যায়ের ইতি। খালেদা জিয়ার প্রয়াণ এবং হাসিনার অনুপস্থিতিতে ৩৫ বছর পর বাংলাদেশ একেবারে নতুন মুখকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চলেছে। বিএনপি আগেই ঘোষণা করেছিল, ক্ষমতায় এলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানই হবেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি ঢাকা-১৭ এবং বগুড়া-৬ আসনে জয়ী হয়েছেন।
১৭ বছরের স্বেচ্ছানির্বাসন শেষে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন অনেকের কাছে রাজনৈতিক ‘কামব্যাক অব দ্য ডেকেড’ বলেই মনে হচ্ছে।

জামাতের অপ্রত্যাশিত উত্থান
এই নির্বাচনের আরেকটি বড় চমক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-র উত্থান। দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ থাকার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়। ভোটে নেমেই ৬৯টি আসনে এগিয়ে থেকে তারা বড় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
১৯৯১ সালে সর্বোচ্চ ১৮টি আসনে জয়ের রেকর্ড ভেঙে এবারে তারা নজির গড়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তবর্তী জেলা—সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ এবং রংপুর অঞ্চলে তাদের সাফল্য চোখে পড়ার মতো।
জামাতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলের জোটে ছিল নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), যা ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের ছাত্রনেতাদের একাংশ গড়ে তোলে। যদিও প্রত্যাশিত সাফল্য তারা পায়নি, তবু ঢাকা-১১ আসনে এনসিপি প্রার্থী নাহিদ ইসলামের জয় তাৎপর্যপূর্ণ।
আন্দোলন থেকে নির্বাচনের পথে
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে যে গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত সরকারের পতনে গিয়ে দাঁড়ায়। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে দায়িত্ব নেন।
কিন্তু আন্দোলনের আবেগকে ভোটে রূপান্তর করা সবসময় সহজ নয়। ছাত্রনেতৃত্বাধীন দলগুলির সীমিত সাফল্য সেটাই প্রমাণ করে। শেষ পর্যন্ত সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি এবং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভিত্তিই নির্বাচনে প্রাধান্য পেল।
২০ বছর পর ক্ষমতায় ফেরা
২০০১ সালের নির্বাচনে জিতে শেষবার ক্ষমতায় এসেছিল বিএনপি। তারপর দীর্ঘ ২০ বছর তারা ছিল বিরোধী আসনে বা রাজনৈতিক চাপে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং পরবর্তী একাধিক নির্বাচনে ক্ষমতায় থাকে।
তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছিল। তবে হাসিনা সরকারের পতনের পর সেসব মামলা প্রত্যাহার করা হয়। দেশে ফিরে তিনি নির্বাচনী ইস্তেহারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর মতো সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেন। কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের আশ্বাসও ছিল তাঁর ভাষণে।
গণতন্ত্রের ট্র্যাকে ফিরবে বাংলাদেশ?
ফলাফল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল সানাউল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র যেন আর কখনও নির্দিষ্ট নির্বাচনী ট্রেনলাইন থেকে বিচ্যুত না হয়। শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর ভোটগ্রহণ ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়—বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্য—সবকিছু সামলে নতুন সরকারকে দ্রুত আস্থা অর্জন করতে হবে।

সামনে কোন পথ?
বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ অস্থিরতার পর স্থিতিশীলতা চাইছেন। তরুণ প্রজন্ম চাইছে কর্মসংস্থান, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। নতুন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দল সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারবেন, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
তবে আপাতত স্পষ্ট—বাংলাদেশ এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। ৩৫ বছরের রাজনৈতিক দ্বৈরথের পর এক নতুন নেতৃত্বের হাতে দেশের দায়িত্ব তুলে দিয়েছে জনগণ। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে পুরো দক্ষিণ এশিয়াই নজর রাখবে পদ্মাপাড়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে।