সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
বাংলার ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়ার শেষে আজ জাতীয় নির্বাচন কমিশন প্রকাশ করল চূড়ান্ত ভোটার তালিকা। গত চার মাস ধরে একের পর এক বিতর্কের পরে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তাও রয়েছে অসম্পূর্ণ অবস্থায়। তবে এই চূড়ান্ত তালিকা থেকেও কমে গিয়েছে প্রায় ৬৪ লক্ষ ভোটারের নাম। এছাড়াও আরো প্রায় ৬০ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম রয়েছে বাতিল হওয়ার তালিকায় বিবেচনাধীন।
চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় সব জেলা মিলিয়ে প্রায় ৭ লক্ষের বেশি নাম ‘ডিলিটেড’। খসড়া ভোটার তালিকায় আগেই বাদ গেছিল ৫৮ লক্ষের নাম। সব মিলিয়ে রাজ্যজুড়ে আপাতত প্রায় ৬৪ লক্ষের বেশি নাম বাদ পড়েছে বলে জানা গিয়েছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন সূত্রে। শনিবার বিকেলে প্রকাশিত এই তালিকায় দেখা যাচ্ছে, খসড়া পর্ব থেকে চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত রাজ্যে মোট বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২।
এসআইআর-র আগে-পরে ভোটার তালিকা
শনিবার ২৮ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর দেখা গিয়েছে, রাজ্যে মোট যোগ্য ভোটার ৭ কোটি ৮ লক্ষ ১৬ হাজার ৬৩০। এর মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৩ কোটি ৬১ লক্ষ ৯৯ হাজার ৩৯১, মহিলা ভোটার ৩ কোটি ৪৬ লক্ষ ১৫ হাজার ৮৩৭ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১৪০২ জন। ফর্ম ৭ অনুযায়ী বাদ পড়েছেন ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ৫৩ ভোটার। এছাড়া ফর্ম ৬ ও ৬এ-তে নতুন ভোটারের সংখ্যা ১ লক্ষ ৮২ হাজার ৩৬। ফর্ম ৮ অনুযায়ী স্থানান্তরিত ভোটার ১৯ লক্ষ ৮৮ হাজার ৭৬ জন। এছাড়া বিচারাধীন ভোটার অর্থাৎ তথ্যে অসংগতির জেরে যাঁদের নাম এখনও বিবেচনার আওতায়, সেই সংখ্যা ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৩৭৫।
বাদ পড়তে পারে আরো
জাতীয় নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, ১ কোটি ৪২ লক্ষ ভোটারের শুনানি নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৩১ লক্ষ ৬৮ হাজার ৪২৬ জন ভোটার ২০০২ সালের শেষ এসআইআরের সঙ্গে নিজেদের কোনও লিঙ্ক বা সূত্র দেখাতে পারেননি, যাদের ‘নো-ম্যাপিং’ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। বাকি ১ কোটি ২০ লক্ষ ভোটারের তথ্যে অসঙ্গতি ছিল। ৮২ লক্ষ ভোটারের ক্ষেত্রে নথি সঠিক বলে মনে করলেও বাকি ৬০ লক্ষ নাম নিয়েই মূলত আইনি লড়াই ও প্রশাসনিক টানাপড়েন চলছে। শনিবার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরে সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল স্বীকার করে নেন যে, এই বিশাল কর্মযজ্ঞে ‘কিছু ভুলভ্রান্তি’ হয়েছে। তবে তিনি একে ‘সামান্য’ বলে দাবি করেছেন।
নাম বাদ নিয়ে চাপান উত্তর
প্রত্যাশিতভাবেই খাস কলকাতা শহরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচিত ভবানীপুর থেকে শুরু করে উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ অথবা নদীয়ার মতুয়া সম্প্রদায় অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে চূড়ান্ত প্রকাশিত ভোটার তালিকা থেকে। আর তাই নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপান উতোর।
শনিবার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর দেখা গেল, মোট ৪৭ হাজারের বেশি নাম বাদ পড়েছে ভবানীপুরে। তবে আরও ১৪ হাজারের বেশি নাম অমীমাংসিত তালিকায় রয়েছে। ফলে আরও নাম বাদ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই নিয়ে রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত ৪৭ হাজার নাম বাদ গিয়েছে। তবে যাই হোক না কেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার ভবানীপুরে দাঁড়াতে সাহস পাবেন বলে মনে হয় না।’
SIR-এ ১.২০ কোটি নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা! ভবানীপুরে দাঁড়িয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মমতা
গোটা ঘটনা নিয়ে গর্জে উঠেছে তৃণমূল। দলের অফিসিয়াল এক্স হ্যান্ডলে লেখা হয়েছে, ‘বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের নীরব অদৃশ্য কারচুপি সম্পূর্ণ। নোংরা মাত্রা এখন বাংলার চোখের সামনে উন্মোচিত হয়ে উঠেছে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নৈহাটি পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুশান্ত সরকার এবং তাঁর মা আরতি সরকারের নাম বাদ পড়েছে। ভোটার শুদ্ধির এই ষড়যন্ত্রে একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং তাঁর পরিবার ভূতের মতো মুছে গিয়েছে।’

শনিবার এসআইআর-এর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর তৃণমূল সাংসদ মমতাবালার দাবি, মতুয়া অধ্যুষিত এলাকায় ৯০ শতাংশ মানুষের নাম বাদ গিয়েছে। শুধুমাত্র নদিয়াতেই ৪১ লক্ষ ৪৫ হাজার ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা এবারের এসআইআর খসড়া তালিকায় মোট ভোটার ছিল ৭৭ লক্ষ ৭৬ হাজার ২৭৬। চূড়ান্ত তালিকায় বাদ হওয়া ভোটারের সংখ্যাটা ৮৭,৫৪৮। আগেই খসড়া তালিকা থেকে বাদ গিয়েছিল ৮,১৮,৪৩২ নাম। সবমিলিয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় মোট বাদ গিয়েছে ৯,০৫,৯৮০ ভোটারের নাম। এখনও পর্যন্ত এই জেলায় বিচারাধীন রয়েছে ৫ লক্ষ ভোটারের নাম।