সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
যত কান্ড যাদবপুরে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী অনামিকা মণ্ডলের রহস্যজনক মৃত্যুতে নতুন মোড় এসেছে। পরিবারের তরফে খুনের অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর ঘটনার তদন্তভার নিয়েছে লালবাজারের হোমিসাইড বিভাগ। মঙ্গলবার সকালে গোয়েন্দারা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং মূল প্রত্যক্ষদর্শীর খোঁজে তল্লাশি শুরু করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুলিশকে সিসিটিভি ফুটেজ হস্তান্তর করেছে, কিন্তু ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনো ফুটেজ না থাকায় তদন্তকারীরা মূলত প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানের ওপর নির্ভর করছেন। পুলিশ ওই রাতে ঘটনাস্থলের আশেপাশে থাকা তিনজন পড়ুয়াকে দীর্ঘক্ষণ জেরা করেছে। তাদের বক্তব্যে কোনো অসঙ্গতি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদেরও ঘটনাস্থলে নিয়ে আসার কথা ভাবা হচ্ছে। পরিবারের অভিযোগ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান- দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এই ঘটনায় ক্যাম্পাসে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অনামিকার মৃত্যু দুর্ঘটনা নাকি খুন, সেই রহস্যের জট খুলতে জোরকদমে তদন্ত চালাচ্ছে লালবাজার।
গোয়েন্দা আধিকারিকদের একটি বিশেষ দল মঙ্গলবার সকালে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে তদন্ত শুরু করে। প্রথমেই তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে পৌঁছে রেকর্ড খতিয়ে দেখে। এরপর সিসিটিভি ফুটেজ, হোস্টেলের হাজিরা তালিকা, রাত্রিকালীন নিরাপত্তা রাউন্ডের রিপোর্ট-সব কিছু সংগ্রহ করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্রদের আলাদা করে ডেকে জেরা করা হয়। কিছু ছাত্র জানান, হোস্টেলের মধ্যে রাতে নির্দিষ্ট কিছু ঘর থেকে চিৎকার বা অস্বাভাবিক শব্দ শোনা যেত, কিন্তু ভয় বা প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে কেউ মুখ খোলেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীরাও গোয়েন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন। অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেন যে, বিগত কয়েক বছরে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়েছে। বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ, ছাত্র রাজনীতির নামে দাদাগিরি, এমনকি নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়ের অভিযোগও সামনে আসে। শিক্ষকরা চান ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসুক, কিন্তু ছাত্রদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সরাসরি প্রভাব তাঁরা চান না। গোয়েন্দারা হোস্টেলের বিভিন্ন ঘর ঘুরে দেখে, কিছু জায়গায় ছাত্রদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও পরীক্ষা করে। এতে কিছু ছাত্র ক্ষুব্ধ হয় এবং ক্যাম্পাসের গেটের সামনে বিক্ষোভ শুরু করে। কিন্তু গোয়েন্দারা জানান, তাঁদের উদ্দেশ্য কাউকে হেনস্থা করা নয়, বরং প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা।
গত বৃহস্পতিবার রাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরের পুকুরে অনামিকাকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি। অনামিকার পরিবারের অভিযোগ, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত খুন। তাঁদের দাবি, আমার মেয়েকে খুন করা হয়েছে। কোনো অবস্থাতেই সে ওই রাতে একা একা পুকুরের ধারে যেত না। বাবার এই অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশ নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য, ঘটনার দিন রাতে প্রথম কে অনামিকাকে পুকুরে পড়ে থাকতে দেখেছিলেন, তা খুঁজে বের করা। এই মুহূর্তে পুলিশ জানতে চাইছে, সেই ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রী, নাকি কোনো বহিরাগত। এই সূত্র ধরেই তদন্ত এগোচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট ধারণা মেলেনি।