সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
বাংলা সহ দেশের ১২ রাজ্যে মঙ্গলবার থেকেই ভোটার তালিকায় শুরু হচ্ছে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়া। আজ আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা করল জাতীয় নির্বাচন কমিশন। দিল্লির বিজ্ঞান ভবনের অডিটোরিয়াম থেকে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ঘোষণা করেন, আগামীকাল অর্থাৎ মঙ্গলবার 28 অক্টোবর থেকে
পশ্চিমবঙ্গ-সহ ১২ রাজ্যে একসঙ্গে এসআইআর শুরু হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড়, গোয়া, গুজরাত, কেরল, লাক্ষাদীপ, মধ্যপ্রদেশ, পুদুচেরি এবং আন্দামান নিকোবরে শুরু হচ্ছে এসআইআর। তিনি জানান, এসআইআরের মূল উদ্দেশ্য হল, প্রত্যেক যোগ্য ভোটারকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং প্রত্যেক অযোগ্য ভোটারকে ভোটার তালিকা থেকে বের করে দেওয়া। যদিও আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালে বাংলার পাশাপাশি প্রতিবেশী ভাজপাশাসিত অসমেয় বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে এসআইআর করা হচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জানান, ভারতীয় নাগরিকত্ব আইনে অসম রাজ্যের জন্য আলাদা ধারা রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে অসমে নাগরিকত্বের যাচাইকরণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আর গোটা দেশের জন্য এসআইআর সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি যেহেতু ২৪ জুন প্রকাশ করা হয়েছে, সেই কারণে অসমে তা প্রযোজ্য নয়।
বৈধ ভোটারের নাম বাদ গেলে আন্দোলন
তবে ইতিমধ্যেই বিধানসভা ভোটমুখী বিহারে যেভাবে এসআইআর প্রক্রিয়ার ফলে অন্তত ৪৫ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে বলে সুপ্রিম কোর্টে রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষ থেকে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে, সেভাবে বাংলাতেও যদি নির্বাচন কমিশনের অস্বচ্ছ এসআইআর প্রক্রিয়ায় কোন বৈধ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয় তাহলে বড়সড় আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তৃণমূল। তৃণমূলের অন্যতম রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ হুঁশিয়ারি দেন, রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। একজন বৈধ ভোটার, নাগরিকের নাম বাদ দিলেও প্রতিবাদ হবে। বৈধ ভোটারদের হয়রান করা হলে, নাম বাদ গেলে এক লক্ষ কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে গিয়ে দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের অফিস ঘেরাও হবে। যদি দেখা যায়, মানুষকে হয়রান করার চেষ্টা হচ্ছে, তাহলে আইন মেনে প্রতিবাদ হবে বলেও জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।
কিভাবে হবে এসআইআর প্রক্রিয়া
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জানিয়েছেন, শেষবার এসআইআর করা হয়েছিল ২০০২-০৪ সালে। পশ্চিমবঙ্গে ২০০২ এবং ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় যাদের নাম ছিল বা বাবা-মায়ের নাম ছিল, তাঁদের ক্ষেত্রে ওই তালিকাই প্রামাণ্য বলে বিবেচনা করা হবে। যে তালিকা নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধির কাছে থাকবে। তাঁরা কমিশন নির্ধারিত কোনও একটি নথি চাইতে পারেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির থেকে। যে ব্যক্তিদের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ছিল না, তাঁদের নির্বাচন কমিশনের প্রকাশ করা ১১ নথির মধ্যে যে কোনও একটি নথি দেখাতে হবে। সমস্ত ফর্ম পাওয়ার পরে বিএলও-রা খসড়া প্রকাশ করবে। কোন বুথে ১২০০-র বেশি ভোটার থাকবে না। বয়স্ক এবং প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে ভলান্টিয়াররা সাহায্য করতে পারবেন। ২০০৩ সালে ভোটার তালিকার সঙ্গে ম্যাচিং না হলে সংশ্লিষ্ট ভোটারকে নোটিশ দেওয়া হবে। আধার নম্বর বিকল্প হিসাবে বিহারে দেওয়া হয়েছিল। এবারও সেটা দেওয়া হবে। প্রথমে একজন ভোটারকে দেখাতে হবে, ২০০২, ২০০৩-এর ভোটার তালিকায় তাঁর বা তাঁর বাবা-মায়ের নাম ছিল কি না। যদি কেউ এটা দেখাতে না পারেন, তাহলে কমিশনের তরফে একটি নোটিস জারি করা হবে তাঁর নামে। এরপর হবে হিয়ারিং। সেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে উত্তর দিতে হবে ২০০২ বা ২০০৩ সালে তিনি কোথায় ছিলেন, কেন নাম নেই। যাঁরা রাজ্যের বাইরে থাকেন বা যাঁরা প্রবাসী তাঁদের জন্য অনলাইনেও ফর্ম ফিল আপ ব্যবস্থা রয়েছে। যাঁদের নাম বাদ যাবে, তাঁরা প্রথমে জেলাশাসককে জানাতে পারবেন। তারপর সংশোধনী ক্ষেত্রে ফর্ম ৬, ফর্ম ৭ অথবা ফর্ম ৮ পূরণ করতে পারবেন।
গুরুত্বপূর্ণ তারিখ
২৮ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ফর্ম ছাপা এবং ভোট কর্মীদের প্রশিক্ষণ।
বিএলও বা ভোটকর্মীরা বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ফর্ম দেওয়া-নেওয়া করবেন ৪ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
৯ ডিসেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ হবে।
৯ ডিসেম্বর থেকে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত অভিযোগ জানানো যাবে।
৯ ডিসেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত হিয়ারিং এবং ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া চলবে।
২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হবে।
এসআইআর-এর জন্য কোন কোন নথি গ্রাহ্য
মাধ্যমিক বা তার বেশি কোনও শিক্ষাগত সার্টিফিকেট।
বাড়ি বা জমির দলিল।
জন্ম শংসাপত্র।
পাসপোর্ট।
১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের আগে থাকা পোস্ট অফিস, ব্যাঙ্ক, এলআইসি (জীবন বিমা নিগম) বা স্থানীয় প্রশাসনের প্রদান করা কোনও নথি।
জাতিগত শংসাপত্র।
স্থানীয় প্রশাসনের তরফে যে পারিবারিক রেজিস্ট্রার দেওয়া হয়, সেটি। (বাংলায় এমন পারিবারিক রেজিস্ট্রার পদ্ধতি চালু নেই)
যাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারি বা রাজ্য সরকারি কর্মী ছিলেন, তাঁদের পরিচয়পত্র।
ফরেস্ট রাইট সার্টিফিকেট বা বনভূমির জমির পাট্টা।
রাজ্য সরকার কর্তৃক প্রদেয় বাসস্থানের শংসাপত্র।
কোনও নাগরিকের ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার।
এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী পরিচয়পত্র হিসেবে আধার কার্ড দেখানো যাবে। কিন্তু তা নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে না। নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য আধার কার্ডের সঙ্গে ওই ১১ নথির মধ্যে একটি দেখাতে হবে।