সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
বাংলার ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআরের নামে সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধে ফের সরব হলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পাঠানো চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, এই যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংবেদনশীলতার অভাব রয়েছে। অমর্ত্য সেন বা মহম্মদ শামির মতো ব্যক্তিত্বদের শুনানিতে তলব এবং ৭৭ জনের মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে এই প্রক্রিয়াকে ‘আতঙ্ক’ বলে অভিহিত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতা আরও অভিযোগ করেন, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিয়োগ করা পর্যবেক্ষকরা সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করছেন। বিশেষ করে বিবাহিত মহিলা ও পরিযায়ী শ্রমিকদের সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি এই ব্যবস্থাকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে দাবি করেন। গঙ্গাসাগর মেলার নিরাপত্তার গুরুত্ব মনে করিয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, ত্রুটিপূর্ণ পোর্টাল ও অযৌক্তিক তালিকার মাধ্যমে ভোটার ছাঁটাইয়ের এই চেষ্টা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘আজ আমি ক্ষোভ থেকে, দায়িত্ববোধ থেকে এবং গণতন্ত্রের প্রতি আমার অবিচল অঙ্গীকার থেকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে একটি বিস্তারিত চিঠি লিখেছি। এসআইআর-এর আড়ালে বাংলায় যা ঘটছে, তা সাধারণ নাগরিকদের মর্যাদা, জীবিকা এবং সাংবিধানিক অধিকারের উপর একটি উদ্বেগজনক আক্রমণ।
যে প্রক্রিয়াটি অন্তর্ভুক্তির জন্য তৈরি হয়েছিল, তা এখন ভয় দেখানো এবং বাদ দেওয়ার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। শুনানিগুলো যান্ত্রিকভাবে, সহানুভূতি ছাড়া, বিচার-বিবেচনা ছাড়া এবং মানবিক বাস্তবতার প্রতি কোনও সংবেদনশীলতা ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এর পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ, ৭৭ জনের মৃত্যু, আত্মহত্যার চেষ্টা, হাসপাতালে ভর্তি-সবকিছুই একটি অপরিকল্পিত, জবরদস্তিমূলক প্রক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট ভয়, আতঙ্ক এবং উদ্বেগের সাথে সম্পর্কিত।
যখন অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের মতো একজন নোবেল বিজয়ী, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ক্রীড়াবিদ, সন্ন্যাসী এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিজেদের ‘প্রমাণ’ করার জন্য তলব করা হয়, তখন তা চরম প্রাতিষ্ঠানিক ঔদ্ধত্যকেই প্রকাশ করে। যদি এমন বরেণ্য ব্যক্তিদেরও রেহাই না দেওয়া হয়, তবে দরিদ্রতম মানুষ, বয়স্ক ব্যক্তি, পরিযায়ী শ্রমিক, দিনমজুর এবং বিয়ের পর পদবি পরিবর্তন করা মহিলাদের দুর্দশার কথা ভাবুন।
মনে হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক ভূমিকা থেকে বিপজ্জনকভাবে সরে যাচ্ছে। কিন্তু গণতন্ত্র ভয় দিয়ে টিকে থাকে না। জবরদস্তি করে ভোটার তালিকা শুদ্ধ করা যায় না। আর সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ জবাবদিহিহীন প্রভুর মতো আচরণ করে সম্মান অর্জন করতে পারে না। আমি এই উদ্বেগগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সামনে তুলে ধরেছি। এখনও পথ সংশোধনের জন্য খুব বেশি দেরি হয়ে যায়নি। আমি আশা করি শুভবুদ্ধির উদয় হবে। আমি আশা করি নাগরিকদের যন্ত্রণার অবসান হবে। এবং আমি আশা করি অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার আগেই আমাদের গণতন্ত্রের পবিত্রতা পুনরুদ্ধার করা হবে।’
চিঠিতে নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক একাধিক সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপকে ‘গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। ছাপা চিঠির শেষে হাতে লিখে মুখ্যমন্ত্রী এও লিখেছেন, ‘জানি আপনি কোনও উত্তর দেবেন না, কিন্তু সমস্ত তথ্য আপনার কাছে তুলে ধরা আমার কর্তব্য।’