সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
বাংলার বামপন্থী রাজনীতিতে বিদ্রোহী নেতা বলে পরিচিত সমীর পুততুণ্ড প্রয়াত হলেন। রবিবার রাতে ৭৪ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন প্রবীণ এই বামপন্থী নেতা। বেশ কিছু দিন অসুস্থ ছিলেন প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ। রবিবার রাতে ১১.১৫ মিনিট নাগাদ ইএম বাইপাস লাগোয়া মুকুন্দপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর।
সমীর পুততুণ্ডের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সমীর পুততুণ্ডর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘একদা বাম আন্দোলনের শক্তিশালী নেতা সমীর পুততুণ্ডকে হারিয়ে আমি খুবই মর্মাহত বোধ করছি। মনে হচ্ছে, আমি নিজের কাউকে হারালাম। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনে একসঙ্গে কাজ করেছি।’ প্রয়াত নেতার স্ত্রীকে সমবেদনা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আরও লিখেছেন, ‘অনুরাধাদিকে সান্ত্বনা জানানোর ভাষা নেই, তবুও সর্বদা পাশে আছি।’
একসময়ের লাল দুর্গ বলে পরিচিত দক্ষিণ ২৪ পরগণায় সিপিএমের জেলা সম্পাদকের দায়িত্ব সামলেছেন সমীর পুততুণ্ড। যদিও ২০০১ সালে বিধানসভা নির্বাচনের আগে দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে সিপিএম ছেড়ে বেরিয়ে আসেন সমীর পুততুণ্ড ও সইফুদ্দিন চৌধুরী। নতুন দল পিডিএস তৈরি করেন তাঁরা। ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যাদবপুর কেন্দ্র থেকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে প্রার্থীও হন সমীরবাবু। যদিও সেই ভোটে একেবারেই ছাপ ফেলতে পারেননি তিনি। আটের দশকের কিছু আগে থেকে সমীর পুততুণ্ডের রাজনৈতিক জীবন শুরু। জনতার কাজের জন্য সিপিএমের হাত ধরেই তা শুরু করেছিলেন। কাস্তে-হাতুড়ি-তারায় ভর করে জনসংযোগ থেকে সংগ্রাম, প্রাণঢালা কাজ করেছেন। প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে দক্ষিণ ২৪ পরগনার দাপুটে নেতার ভূমিকায় সমীর পুততুণ্ডকে দেখেছিলেন সকলে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে বামফ্রন্টের সবচেয়ে বড় শরিক সিপিএমের সঙ্গে মতানৈক্য শুরু হয় তাঁর। এক সাক্ষাৎকারে সমীরবাবু বলেছিলেন, বাম আদর্শ অনেক বড়। তার বাস্তবায়নে কোনও ফাঁকি চলে না, নিঃসন্দেহে কঠিন পথ। কিন্তু বামেদের বড় শরিক সিপিএম নীতি, আদর্শ থেকে সরে সুবিধাবাদী রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছে, যা একজন খাঁটি বামপন্থী হয়ে মেনে নেওয়া কঠিন।
পরবর্তী সময়ে অবশ্য সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রাম আন্দোলন পর্বে তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সমীর পুততুণ্ড। বরাবর একরোখা, আপসহীন, ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’ এক ব্যক্তি হিসেবে নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন পার্টি অফ ডেমোক্রেটিক সোশালিজমের প্রতিষ্ঠাতা সমীর পুততুণ্ড। নিজের আদর্শ নিয়ে রাজনীতির পথে এগিয়ে চললেও শেষ পর্যন্ত বড় আক্ষেপ ছিল সদ্যপ্রয়াত পিডিএস সদস্যের। সে আক্ষেপ হল, সিপিএম নিজেদের ভুলগুলি শুধরে ভুলের রাস্তা আরও চওড়া করেছে।

তাঁর মতে, তৃণমূল ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে অজ্ঞানতাবশত বিজেপির জন্য রাস্তা প্রশস্ত করেছিল সিপিএম। সরকার থেকে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সিপিএমের ঝুলিতে ত্রুটির পর ত্রুটি জমা হয়েছে বলে মনে করেন সমীরবাবু। ঠিকমতো শত্রু চিহ্নিত করতে না পারা, জনতার কাছে সঠিক ইস্যু উপস্থাপিত না করতে পারা এবং ধীরে ধীরে জনবিচ্ছিন্নতার জেরে সিপিএম আর কখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারল না বলে মনে করতেন তিনি।