সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘নির্বাচন কমিশন বিজেপির আইটি সেল হয়ে কাজ করছে।’ দিল্লিতে জাতীয় নির্বাচন সদনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে বৈঠকের পরে বেরিয়ে এসে এভাবেই বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বৈঠক শেষে তিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অহংকার ও মিথ্যাচারের অভিযোগ তুলে বলেন, তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি এমন আচরণ আগে কখনও দেখেননি।
সোমবার দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের দফতরে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে জানানো হয়েছে, ১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল এই বৈঠকে অংশ নেয়। ওই দলে ছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, দলের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রভাবিত ১২টি পরিবারের সদস্যরা। তৃণমূল সূত্রে জানা গিয়েছে, এসআইআর-প্রভাবিত যে ১২ জন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে পাঁচজন এমন ভোটার রয়েছেন যাঁদের ভুলভাবে মৃত ঘোষণা করে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, পাঁচজন এমন পরিবারের সদস্য ছিলেন, যাঁদের স্বজনরা এসআইআর নোটিস পাওয়ার পর মানসিক চাপে প্রাণ হারিয়েছেন বলে অভিযোগ। আরও তিনটি পরিবারের প্রতিনিধিরাও ছিলেন, যাঁদের ক্ষেত্রে অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট এলাকার বিএলও কাজের অতিরিক্ত চাপের কারণে মৃত্যু হয়েছে।
বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমি খুবই দুঃখিত। দিল্লির রাজনীতিতে আমি দীর্ঘদিন ধরে আছি। চারবার মন্ত্রী হয়েছি, সাতবার সাংসদ হয়েছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত এত অহংকারী ও মিথ্যাবাদী নির্বাচন কমিশনার দেখিনি। আমি তাঁকে বলেছি, আমি আপনার চেয়ারকে সম্মান করি, কারণ কোনও চেয়ারই চিরস্থায়ী নয়। একদিন তো আপনাকেও যেতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাকেই কেন টার্গেট করা হচ্ছে?’
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব হলেও পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯৮ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনও সুযোগ না দিয়েই। তাঁর দাবি, এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে একতরফা ও অগণতান্ত্রিক। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে চলমান এসআইআর প্রক্রিয়া পক্ষপাতদুষ্ট, স্বেচ্ছাচারী ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এর ফলে বহু বৈধ ভোটারের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এই গুরুতর উদ্বেগের কথা সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কাছে জানাতেই মুখ্যমন্ত্রী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ প্রভাবিত পরিবারগুলিকে সঙ্গে নিয়ে কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও দাবি করেন, এসআইআর-এর জেরে রাজ্যজুড়ে আতঙ্ক ও চরম মানসিক চাপের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার ফলে অন্তত ১৪০ থেকে ১৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বহু মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে মৃত ঘোষণা করে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যাতে তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া যায়। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও গরিব মানুষদের লক্ষ্য করেই এই প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। আজ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার-সহ নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে বৈঠক করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছিলেন বৈঠকে। আর ছিলেন মৃত ৩ বিএলও’র পরিবার এবং এসআইআরে ক্ষতিগ্রস্ত ৫ পরিবার। প্রত্যেকের পরনে কালো পোশাক। কারও পরনে কালো চাদর, কেউ আবার পরেন কালো সোয়েটার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘আমাদের অসম্মান, অপমান করা হয়েছে। ওঁদের বলেছি আমরা আপনাদের কুর্সিকে সম্মান করি। কারও জন্য কুর্সি চিরন্তন নয়। কেন বাংলাকে নিশানা করা হচ্ছে? আজকে যদি অটলজি বেঁচে থাকতেন, উনি কি জন্ম শংসাপত্র দিতে পারতেন?’

এদিন এসআইআর ইস্যুতে কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে তিনি বলেন যে, ‘সীমা খন্না কে? নির্বাচন কমিশনের কেউ নয়। বিজেপির আইটি সেলের লোক। তিনি ৫৮ লক্ষকে বাদ দিয়েছেন। তবুও নির্বাচন কমিশন কোনও প্রশ্ন করেনি।” তিনি আরও বলেন যে, জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে বৈঠক বয়কট করে চলে এসেছি। তিনি আমাদের অপমান করেছেন। অসমন্মানজনক কথা বলেছেন। ওঁদেরকে বলেছি আমরা আপনাদের কুর্সিকে সম্মান করি। কারও জন্য কুর্সি চিরন্তন নয়। তার পরও বাংলাকে কেন এত অসম্মান।’