তারকেশ্বরে প্রথম মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি বলে দাবি মহন্তের, উন্নয়ন, ধর্মীয় পর্যটন ও তীর্থ সার্কিট নিয়ে একগুচ্ছ ঘোষণা; বিগত সরকারকেও তীব্র নিশানা শুভেন্দুর
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
তারকেশ্বর (Tarakeswar), হুগলির (Hooghly) ঐতিহ্যবাহী শ্রাবণী মেলার মঞ্চ থেকেই বড় ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী [শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)]। লক্ষ্য একটাই—তারকেশ্বরকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে আগামী দিনে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে উঠে আসে এই পুণ্যক্ষেত্র। কাশী বিশ্বনাথ ও মহাকাল মন্দিরের উন্নয়নের উদাহরণ টেনে তিনি জানালেন, একই মডেলে সাজানো হবে তারকেশ্বর মন্দিরও।
শ্রাবণী মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনে উপস্থিত হয়ে মুখ্যমন্ত্রী প্রথমেই তারকেশ্বর মন্দিরের মহন্তকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেন। এরপর মঞ্চ থেকে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাবা মহাদেবের এই পবিত্র স্থানে প্রথা মেনে পুজো করার সুযোগ তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। সেই অভিজ্ঞতার পরই তিনি তারকেশ্বর উন্নয়ন অথরিটি এবং অতিরিক্ত জেলা শাসককে এলাকার সামগ্রিক উন্নয়নের দায়িত্ব দিয়েছেন বলে জানান।
শুভেন্দুর কথায়, আগামী দিনে শুধু শ্রাবণী মেলাই নয়, গোটা তারকেশ্বরকেই আন্তর্জাতিক মানের ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। তাঁর দাবি, যেমনভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্যোগে মহাকাল করিডর এবং কাশী বিশ্বনাথ ধাম নতুন রূপ পেয়েছে, তেমনই উন্নয়নের ছোঁয়া পাবে তারকেশ্বরও। ভবিষ্যতে বিদেশি পর্যটকদের কাছেও এই তীর্থক্ষেত্রকে আকর্ষণীয় করে তোলাই সরকারের লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
মঞ্চ থেকেই মুখ্যমন্ত্রী আরও ঘোষণা করেন, শ্রাবণী মেলাকে জাতীয় স্তরের মেলার মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি রাজ্যজুড়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তীর্থক্ষেত্র সার্কিট গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান। তাঁর বক্তব্য, আগামী দু’বছরের জন্য এই প্রকল্পে ১,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, বাংলার গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানগুলিকে আধুনিক পরিকাঠামো, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যটন পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত করা।
তারকেশ্বরে পুণ্যার্থীদের সুবিধার জন্য সরকারি সেবা কেন্দ্র, উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা, পানীয় জল, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার আশ্বাসও দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতিবছর হাজার হাজার ভক্ত দীর্ঘ পথ হেঁটে জল নিয়ে এসে বাবা তারকনাথের মাথায় অর্পণ করেন। তাঁদের কষ্ট কমাতে প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই সভা থেকেই বিগত সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণও শানান শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তারকেশ্বরের মতো ঐতিহ্যবাহী তীর্থস্থান অবহেলিত ছিল। পুণ্যার্থীদের জন্য ন্যূনতম ব্যবস্থাও করা হয়নি। শুধুমাত্র কয়েকজন সিভিক ভলান্টিয়ারের উপর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে প্রশাসন নিজেদের কর্তব্য শেষ করেছে বলে কটাক্ষ করেন তিনি।
উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ-এর কাজের প্রশংসা করে শুভেন্দু বলেন, ধর্মীয় পর্যটনকে কীভাবে উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তা দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভবিষ্যতে তারকেশ্বরের জলযাত্রীদের উপরও পুষ্পবৃষ্টির মতো উদ্যোগ নেওয়ার ইঙ্গিত দেন তিনি। তাঁর দাবি, ধর্মীয় ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে উন্নয়নের নতুন দৃষ্টান্ত গড়াই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।
এদিনের অনুষ্ঠানে তারকেশ্বর মন্দিরের মহন্তও শুভেন্দুর উপস্থিতিকে ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, শ্রাবণী মেলার উদ্বোধনে এর আগে কোনও মুখ্যমন্ত্রী উপস্থিত হননি। শুভেন্দুর আগমন এই মেলার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ধর্মীয় আবেগ, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি এবং রাজনৈতিক বার্তা—এই তিনকে একসঙ্গে সামনে রেখে তারকেশ্বর থেকে বড় বার্তা দিল রাজ্য সরকার। এখন নজর একটাই—ঘোষণাগুলি কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, আর সত্যিই কি কাশী-বিশ্বনাথের আদলে নতুন পরিচয় পায় তারকেশ্বর? সেই উত্তরই খুঁজবে বাংলা।