গভীর সমুদ্রে প্রাণ হারানো মৎস্যজীবীদের পরিবারের পাশে রাজ্য, ক্ষতিপূরণের চেক তুলে দিয়ে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানেরও প্রতিশ্রুতি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
কনিষ্ক সামন্ত। কলকাতা সারাদিন।
শোকের সেই ক্ষত এখনও শুকোয়নি। শঙ্করপুরের গভীর সমুদ্রে প্রাণ হারানো ১৫ মৎস্যজীবীর পরিবারের কান্না আজও থামেনি। সেই আবহেই বড় পদক্ষেপ নিল রাজ্য সরকার। আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিয়ে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
রবিবার রামনগর-১ ব্লক (Ramnagar-1 Block) অফিসে আয়োজিত এক সরকারি অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) শঙ্করপুর ট্রলার দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ১৫ জন মৎস্যজীবীর পরিবারের হাতে প্রতি পরিবারকে ৫ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তার চেক তুলে দেন। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটের মধ্যে থাকা পরিবারগুলির কাছে এই সহায়তা কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দেবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
শুধু আর্থিক সহায়তাই নয়, প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের একজন যোগ্য সদস্যকে রাজ্য পুলিশের হোমগার্ড বা সিভিক ভলান্টিয়ার পদে নিয়োগের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হল দুর্ঘটনার পরে পরিবারগুলির ভবিষ্যৎ জীবিকা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের পাশে দীর্ঘমেয়াদে দাঁড়ানো।
উল্লেখ্য, এই সিদ্ধান্তের কথা আগেই বিধানসভায় ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, ট্রলার দুর্ঘটনায় মৃত প্রত্যেক মৎস্যজীবীর পরিবারকে ৫ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে এবং পরিবারের একজন সদস্যকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া হবে। রবিবার সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হল প্রশাসনিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।
প্রসঙ্গত, গত ২ জুলাই শঙ্করপুর মৎস্যবন্দর (Shankarpur Fishing Harbour) থেকে ‘জয় মা কালী’ নামে একটি ট্রলার ১৫ জন মৎস্যজীবীকে নিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে রওনা দেয়। কিন্তু সমুদ্রে প্রবল দুর্যোগ ও খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে ট্রলারটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা এবং দীর্ঘ অনুসন্ধান অভিযান।
কয়েকদিন পরে বকখালি সংলগ্ন বাঘেরচর (Bagher Char, Bakkhali) এলাকার গভীর সমুদ্রে উল্টে থাকা অবস্থায় ট্রলারটির সন্ধান মেলে। উদ্ধারকারী দল ট্রলার থেকে একাধিক মৎস্যজীবীর দেহ উদ্ধার করে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় উপকূলজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। বহু পরিবার এক মুহূর্তে হারিয়ে ফেলে তাঁদের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে।
দুর্ঘটনার পর প্রশাসন, উপকূলরক্ষী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজদের খোঁজে তল্লাশি চালালেও সব নিখোঁজের সন্ধান মেলেনি। সেই ঘটনার অভিঘাত এখনও স্পষ্ট শঙ্করপুর ও আশপাশের মৎস্যজীবী মহলে।
রবিবারের অনুষ্ঠানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের হাতে সহায়তার চেক তুলে দেওয়ার সময় আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। অনেকেই জানান, প্রিয়জনকে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়, তবে সরকারের এই আর্থিক সহায়তা এবং চাকরির প্রতিশ্রুতি আগামী দিনের লড়াইয়ে কিছুটা ভরসা জোগাবে।
উপকূল এলাকার মৎস্যজীবীদের একাংশের মতে, সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবসময়ই থাকে। তাই শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা, আবহাওয়ার আগাম সতর্কতা এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নও অত্যন্ত জরুরি।

রাজনৈতিক মহলেরও নজর এখন এই উদ্যোগের দিকে। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানোর বার্তা যেমন স্পষ্ট হয়েছে, তেমনই উপকূলবর্তী এলাকার মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এখন প্রশ্ন একটাই—এই সহায়তার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে আর কোনও পরিবারকে এমন হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সেই লক্ষ্যে কী নতুন পদক্ষেপ নেয় প্রশাসন? সেদিকেই তাকিয়ে উপকূলের মানুষ।